শ্রমিক অসন্তোষ, কারখানায় হামলা-ভাঙচুর এবং সড়ক অবরোধের মতো পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের পোশাক খাত। এই অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নতুন ক্রয়াদেশ, রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের ওপর। শুধুমাত্র গত ৩ দিনে পোশাক খাতে মোট ১৫৫৯ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলো যখন আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছে, তখন দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা প্রতিযোগিতায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিদেশি ক্রেতারা পণ্য সরবরাহের সময়সূচি নিয়ে উদ্বেগ জানাচ্ছেন। অনেক ক্রেতা আগামী ২ মাসের ক্রয়াদেশ কমানোর কথা ভাবছেন এবং কিছু ক্রয়াদেশ ভারত বা পাকিস্তানের মতো দেশে স্থানান্তরের তথ্যও পাওয়া গেছে।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত তিন দিনে পোশাক খাতে রপ্তানি মূল্য বাবদ প্রায় ৮৫৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৪৬১টি কারখানা বন্ধ ছিল। একই সময়ে বিকেএমইএ জানিয়েছে, তাদের আওতাধীন খাতে গত ৩ দিনে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে।
বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলনের কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি বলেন, শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প না বাঁচলে শ্রমিক বাঁচবে না। তার মতে, উৎপাদন ক্ষতি হয়তো পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব, কিন্তু দেশের যে ইমেজ সংকট তৈরি হচ্ছে, তার দায় কে নেবে? তিনি আরও বলেন, কিছুদিন পরপর এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে গার্মেন্টস শিল্প বন্ধ হতে বাধ্য।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান মনে করেন, শ্রমিক আন্দোলনের ফলে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করছেন। এর ফলে বিলাসবহুল পণ্যের পরিবর্তে তারা সাধারণ পোশাকের অর্ডার দিচ্ছেন এবং জাহাজীকরণের নিশ্চয়তা চাইছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে পণ্য রপ্তানি বাড়লেও টাকার অঙ্কে আয় কমেছে। নারায়ণগঞ্জে অনেক কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও কিছু কারখানায় শ্রমিক আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাসলিমা আখতার বলেন, শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, তাই এখন বোর্ডকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া উচিত। তিনি শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, আন্দোলনের নামে কারখানায় আগুন দেওয়া বা উৎপাদন ব্যাহত করা হলে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদেরই ক্ষতি হবে, কারণ কারখানা হলো তাদের রুটি-রুজির জায়গা। তিনি আরও বলেন, বহির্বিশ্বে শিল্পের ইমেজ সম্পর্কে শ্রমিকদের গভীরভাবে ভাবতে হবে, কারণ ক্রেতারা অর্ডার সরিয়ে নিলে সবারই ক্ষতি হবে।