মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে ব্যাপক কৌতূহল। যদিও বিএনপির শীর্ষস্থানীয় কয়েক নেতার পাশাপাশি দলের বাইরেও দু-একজনের নাম সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় আছে, তবে প্রকৃত অর্থে কে ওই পদে মনোনয়ন পাবেন, তা নির্ভর করছে সংসদনেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর। বিগত সময়ে বিএনপির মনোনীত তিনজন রাষ্ট্রপতির বিষয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে দলটিকে। বিশ্লেষকদের মতে, সেই অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এবার দলটি অনেক ভেবেচিন্তে এবং সময় নিয়ে রাষ্ট্রপতির নাম ঘোষণা করতে চায়।
বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, দলটি এমন একজনকে ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চায় যিনি দক্ষ, সাহসী, অভিজ্ঞ এবং সর্বোপরি সব মহলে গ্রহণযোগ্য। দলীয় আনুগত্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সততা ও প্রজ্ঞাকেও এবার বড় করে দেখা হচ্ছে। দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা করেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ধারা সমুন্নত রেখে দেশের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে এই পদে আসীন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, দলের চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর নেতাকর্মীদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তিনি বলেন, সব দিক বিশ্লেষণ করেই তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন। এদিকে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনেই ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন হতে পারে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিএনপি মূলত তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে: দেশ ও দলের প্রতি আস্থা, দক্ষতা ও প্রজ্ঞা এবং সাহসিকতা। ১৯৯৬ সালের মে মাসে বিএনপি সরকারের রাষ্ট্রপতি থাকাকালে আবদুর রহমান বিশ্বাসের সাহসিকতায় তৎকালীন সেনাপ্রধান লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের একটি অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। অন্যদিকে, ২০০৬ সালে বিএনপির ক্ষমতা ছাড়ার পর রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়েছিলেন অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। বিএনপির প্রতি আনুগত্য থাকলেও অদক্ষতার কারণে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি ব্যর্থ হন বলে মনে করা হয়, যার ফলে এক-এগারোর জরুরি সরকার ক্ষমতায় আসে এবং তিনি পদ ছাড়তে বাধ্য হন।
বিএনপির নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ক্ষেত্রেও তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর তাকে প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরে রাষ্ট্রপতি করা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন না করা, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বাণীতে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক উল্লেখ না করা এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে মুন্সীগঞ্জে স্বাগত জানিয়ে ছেলে মাহী বি. চৌধুরীর তোরণ নির্মাণসহ কয়েকটি ঘটনায় মাত্র সাত মাসের মধ্যে বিএনপির সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। এসব ঘটনার সূত্র ধরে ২০০২ সালের ১৯ ও ২০ জুন বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় তাকে ‘ইমপিচ’ করার সিদ্ধান্ত হলে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে ২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বি. চৌধুরী ও তার ছেলে মাহী বি. চৌধুরীর সব কর্মকাণ্ডই ছিল বিএনপিবিরোধী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, আগের রাষ্ট্রপতিদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এবার একজন সৎ, মর্যাদাবান ও সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরীও জাতীয় সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রপ্রধানের নিরপেক্ষ ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথা বলেছেন। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ও দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিই রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্য। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে ২২ জন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ পেয়েছেন, যার মধ্যে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। সব মিলিয়ে বিতর্ক এড়াতে এবার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এগোচ্ছে বিএনপি।