জুনে পাইকারি পর্যায়ে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ ও গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। তবুও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানিস্বল্পতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। গ্যাসের সংকট পুরোপুরি কাটেনি এবং ব্যয়বহুল জ্বালানি তেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে না। ফলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে গেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি হচ্ছে। সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট, যা আগের দিন ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত আওয়ামী লীগ সরকার দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার ও খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। জ্বালানি নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র বসে থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়া দিতে হচ্ছে। পিডিবির কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা এখনো প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবছর সরকারের ভর্তুকি বাড়লেও মানুষের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি। ২০২২ সাল থেকে প্রতিবছর গরম বাড়লেই লোডশেডিং দেখা দেয় এবং ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তিতে পড়ে। তবে বৃষ্টি নামলে বিদ্যুৎ চাহিদা কমে মানুষ কিছুটা স্বস্তি পায়।
পিডিবির দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সুফল পেতে দুই মাস সময় লাগে, তাই বাড়তি আয় এখনো হিসাবে আসেনি। তবে দাম বাড়ানোর পর পিডিবির বকেয়া নতুন করে আর বাড়বে না এবং পুরোনো বকেয়া ধাপে ধাপে শোধ করা হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট। গতকাল সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট। দিনের অধিকাংশ সময় অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। গ্যাস থেকে উৎপাদন হচ্ছে ৪ হাজার মেগাওয়াটের কম এবং গ্যাসের সরবরাহ বাড়তে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ালে খরচ বেড়ে যাবে বলে সেগুলো কম চালানো হচ্ছে। রাতের বেলায় টানা কয়েক ঘণ্টা তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হলেও বেশির ভাগ সময় তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গড়ে দেড় হাজার মেগাওয়াটের কম চলছে।
গতকাল বিকেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছে পিডিবি। বৈঠক সূত্র বলছে, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র গতকাল সন্ধ্যায় ৮০০ মেগাওয়াট সরবরাহ করছিল এবং তাদের সরবরাহ আরও বাড়াতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যদিও কয়লাচালিত কেন্দ্রে তাৎক্ষণিক উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ কম, তবুও তারা ধীরে ধীরে তা বাড়াচ্ছে। আদানির কেন্দ্রকেও উৎপাদন বাড়াতে বলা হয়েছে। জনসংযোগ কোম্পানি ফাইভ ডব্লিউ পাবলিক রিলেশনের মাধ্যমে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র জানিয়েছে, ১১ আগস্ট রাত থেকে ১২ আগস্ট সকালের মধ্যে কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, গ্যাসের স্বল্পতা ও কয়লা থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় তেলচালিত কেন্দ্র সারা দিন চালানো ব্যয়বহুল। সন্ধ্যার পর লোডশেডিং সহনীয় রাখতে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে, কিন্তু মধ্যরাতের পর উৎপাদন কমানোয় লোডশেডিং বেড়ে যাচ্ছে।
পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে মূল ভরসা এখন কয়লাচালিত কেন্দ্র। তিনটি বড় কেন্দ্র থেকে সরবরাহ কমেছে। রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য ২ আগস্ট থেকে পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছিল, যা গত রোববার রাত থেকে আবার বাড়তে শুরু করেছে। তবে কেন্দ্রটির পাওনা ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি হওয়ায় বিল না পেলে কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। পটুয়াখালীর আরেকটি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কয়লার স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। এছাড়া ঝড়-বৃষ্টিতে কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়েছে ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র।
ঢাকার দুই বিতরণ সংস্থা ডেসকো ও ডিপিডিসি সূত্র বলছে, তাদের চাহিদায় ঘাটতি নেই। তবে ঢাকার বাইরের চারটি বিতরণ সংস্থার সূত্র বলছে, চাহিদার তুলনায় খুব কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে আরইবি, যারা সারা দেশের গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। পিডিবি ও আরইবি মিলে ফেনী জেলার বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ১৪০ মেগাওয়াট, যেখানে গড়ে প্রতিদিন ঘাটতি ৩০ মেগাওয়াট। ফেনীর স্টারলাইন ফুড প্রোডাক্ট প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক মো. মাইন উদ্দিন জানান, কারখানার উৎপাদনে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ শতাংশ সময় লোডশেডিং হচ্ছে। ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের এজিএম মোহাম্মদ বাইজিদ হোসেন শাহ জানান, ফেনীতে পল্লী বিদ্যুতের ১৫ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে।
ঢাকার কেরানীগঞ্জের গৃহবধূ রোকেয়া বেগম জানান, দিনে বিদ্যুৎ থাকে না এবং প্রচণ্ড গরমে বাচ্চারা কান্নাকাটি করে, রাতেও ঘুমানোর সুযোগ নেই। ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪-এর মহাব্যবস্থাপক গোলাম কাউসার তালুকদার জানান, কেরানীগঞ্জে ২৪০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে প্রতিদিন ৮০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে। নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার বাঘবেড় গ্রামের আক্কাস আলী আকন্দ জানান, ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ৫ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক আকরাম হোসেন জানান, ১৫৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে ৫৯ মেগাওয়াট। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি চা-বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক দেবাশীষ রায় জানান, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় প্রক্রিয়াজাত পাতা নষ্ট হয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে। নীলফামারী জেলা সদরের দোগাছি গ্রামের সাদ্দাম আলী জানান, গরমে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, তার ওপর লোডশেডিংয়ের কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। ডোমার উপজেলা নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নওশাদ আলী জানান, প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়ায় গ্রাহকরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না।