ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে গড়ে ওঠা প্রেমের সম্পর্ক রূপ নেয় চরম নৃশংসতায়। ব্যক্তিগত ছবি আদান-প্রদান এবং তা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে টানাপোড়েনের জেরে পরিকল্পিতভাবে খুন হতে হয় সাজ্জাদ হোসেন (২৪) নামের এক যুবককে। রাজধানীর বছিলার একটি ফাঁকা মেসে ডেকে নিয়ে তাঁকে হত্যার পর লাশ ৯ টুকরো করে দুটি জেলায় ফেলে দেওয়া হয়। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে, যার ভিত্তিতে বর্তমানে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম চলছে।
হত্যাকাণ্ডের শিকার সাজ্জাদ হোসেন ছিলেন তাঁর মা-বাবার একমাত্র সন্তান। সাভারের হেমায়েতপুরে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন এবং স্থানীয় একটি কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করে রাজধানীর বনানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছিলেন। অন্যদিকে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সুমাইয়া তৃষ্ণা (২৬) ও তাঁর স্বামী রোকনুজ্জামান পলাশ (২৬) ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ২০২৩ সালে তাঁরা গোপনে বিয়ে করলেও পরিবারের কেউ তা জানত না। সুমাইয়া থাকতেন মোহাম্মদপুরে তাঁর পরিবারের সঙ্গে এবং রোকনুজ্জামান থাকতেন বছিলার একটি মেসে।
পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, একটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সাজ্জাদের সঙ্গে সুমাইয়ার পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সুমাইয়ার দাবি, ২০২৫ সালের ১ মার্চ মেসেঞ্জারে তাঁর স্বামী রোকনুজ্জামান ব্যক্তিগত ছবি চাইলে তিনি ভুলবশত তা সাজ্জাদের ব্যবহৃত 'সুপ্ত' নামের আইডিতে পাঠিয়ে দেন। এরপর থেকেই সাজ্জাদ তাঁকে ব্ল্যাকমেইল করতে শুরু করেন। তবে তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের ঢাকা জেলার পুলিশ পরিদর্শক জামাল উদ্দীন জানান, তাঁদের মধ্যে প্রায় দুই মাসের প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং একাধিকবার শারীরিক ঘনিষ্ঠতাও হয়েছিল। বিষয়টি স্বামী রোকনুজ্জামান জেনে যাওয়ার পর তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। পরে নিজের অপরাধ লুকাতে ও স্বামীর কাছে নির্দোষ প্রমাণ করতে সুমাইয়া স্বামীকে নিয়ে সাজ্জাদকে হত্যার পরিকল্পনায় অংশ নেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল রাতে রোকনুজ্জামান এক রিকশাচালককে ৫০০ টাকা দিয়ে তাঁর নামে নিবন্ধিত একটি সিম কার্ড সংগ্রহ করেন। ওই নম্বর থেকে সাজ্জাদকে ফোন করে পরদিন সকালে বছিলার মেসে আসতে বলেন সুমাইয়া। ঈদের ছুটিতে মেস ফাঁকা থাকার সুযোগ নিয়ে সাজ্জাদ সেখানে পৌঁছালে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী গোসলখানায় লুকিয়ে থাকা রোকনুজ্জামান পেছন থেকে এসে ছুরি দিয়ে সাজ্জাদের মুখ ও পিঠে আঘাত করেন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সাজ্জাদ নিস্তেজ হয়ে পড়েন।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে রোকনুজ্জামান জানান, সাজ্জাদের মৃত্যুর পর পুরো মেঝে রক্তে ভেসে যায়। প্রথমে লাশ সরানোর চেষ্টা ব্যর্থ হলে তাঁরা লাশটি টুকরো করার সিদ্ধান্ত নেন। এজন্য চালের বস্তা, চটের ব্যাগ, বড় কার্টন ও স্কচটেপ কেনা হয়। লাশ ৯ টুকরো করে তিনটি কার্টনে ভরে স্কচটেপ দিয়ে ভালোভাবে মুড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর ৪ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে একটি প্রাইভেট কার ভাড়া করে রাতে মুন্সিগঞ্জের মাওয়ার দিকে রওনা হন তাঁরা। পথে মুন্সিগঞ্জের পদ্মা সেতু (উত্তর) থানার মেদিনীমণ্ডল এলাকায় একটি নর্দমায় একটি কার্টন এবং কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়নের মালঞ্চ হাসপাতাল সড়কের পাশের একটি নিচু জমিতে বাকি দুটি কার্টন ফেলে চলে যান।
পরদিন ২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল কেরানীগঞ্জে ফেলে যাওয়া কার্টন থেকে কুকুর একটি পোঁটলা টেনে বের করলে সাজ্জাদের খণ্ডিত দেহাংশ বেরিয়ে আসে। খবর পেয়ে পুলিশ ও পিবিআই ঘটনাস্থল থেকে এবং প্রায় একই সময়ে মুন্সিগঞ্জ থেকেও খণ্ডিত অংশগুলো উদ্ধার করে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এগুলো সাজ্জাদেরই দেহাংশ। এদিকে সাজ্জাদ নিখোঁজ হওয়ার পর ৩ এপ্রিল রাতেই তাঁর বাবা মোহাম্মদ ইউসুফ আলী সাভার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন, যা পরে হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর আসামিরা চুয়াডাঙ্গার জীবননগর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। নিজেদের অবস্থান লুকাতে সুমাইয়া তাঁর ব্যবহৃত সিমটি ফেনীতে গ্রামের বাড়িতে রেখে জীবননগরের উদ্দেশ্যে বাসে ওঠেন। তবে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে এবং বাসে যাত্রীবেশে একজন পুলিশ সদস্য ছদ্মবেশে ওঠেন। ৮ এপ্রিল রাত দেড়টার দিকে জীবননগরে বাস থেকে নামার পর সুমাইয়াকে এবং পরে রোকনুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার তদন্ত শেষে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার আদালতে রোকনুজ্জামান ও সুমাইয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা জামাল উদ্দীন। বর্তমানে মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে ৪০ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। আগামী ৩১ আগস্ট এই মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে। সাজ্জাদের বাবা মোহাম্মদ ইউসুফ আলী আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, তাঁর ছেলের কোনো শত্রু ছিল না এবং তিনি এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার চান। অন্যদিকে সুমাইয়ার আইনজীবী মোজ্জাম্মেল হোসেন দাবি করেছেন, অভিযোগপত্রের সঙ্গে আসামির ১৬৪ ধারার জবানবন্দির অমিল রয়েছে, যা পূর্ণাঙ্গ বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলে স্পষ্ট হবে।