দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বেসরকারি স্কুল ও কলেজে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তত্ত্বাবধানে টেলিটকের কারিগরি সহায়তায় স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে এই বদলি প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে। আগামী ২১ আগস্ট থেকে অনলাইনে বদলির আবেদন গ্রহণ শুরু হবে, যা চলবে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত।
মাউশির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানপ্রধান, সহকারী প্রতিষ্ঠানপ্রধান, প্রদর্শক এবং ট্রেড ইনস্ট্রাক্টরসহ সব এমপিওভুক্ত শিক্ষক এই বদলির জন্য আবেদন করতে পারবেন। আবেদনকারীদের মোবাইল ফোনে পাঠানো ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে নির্ধারিত সফটওয়্যারে আবেদন করতে হবে। বর্তমানে সারা দেশে শিক্ষকদের জন্য ৬১ হাজার ৭৮২টি শূন্যপদ রয়েছে এবং প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষক বদলির আবেদন করতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। শূন্যপদের তুলনায় আবেদনকারীর সংখ্যা কম হওয়ায় অধিকাংশ আবেদনকারীই বদলির সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। আবেদন গ্রহণ ও যাচাই-বাছাই শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, প্রথমবার যোগদানের পর চাকরির দুই বছর পূর্ণ হলে একজন শিক্ষক বদলির আবেদনের যোগ্য হবেন। একইভাবে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের পর কমপক্ষে দুই বছর চাকরি পূর্ণ হলে পরবর্তী বদলির আবেদন করা যাবে। কর্মজীবনে একজন শিক্ষক সর্বোচ্চ তিনবার বদলির সুযোগ পাবেন। মাউশি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শূন্যপদের তালিকা অনলাইনে প্রকাশ করবে এবং ওই শূন্যপদের বিপরীতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন নেওয়া হবে। স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে নীতিমালা অনুযায়ী আবেদন প্রক্রিয়াজাত করে চূড়ান্ত বদলি বা পদায়নের আদেশ দেওয়া হবে।
মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, এই কার্যক্রমটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা তদবিরের সুযোগ রাখা হবে না এবং শিক্ষকদের হয়রানি রোধে বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যেসব শিক্ষক নীতিমালার শর্ত পূরণ করবেন, তারাই আবেদনের যোগ্য হবেন। আইডি-পাসওয়ার্ড না পাওয়াসহ অনলাইনে আবেদন করতে গিয়ে কেউ সমস্যায় পড়লে তা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২০১৬ সাল থেকে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করে আসছে। এর ফলে অনেক শিক্ষক নিজ জেলার বাইরে নিয়োগ পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন। পরিবার ও নিজ জেলা থেকে দূরে থাকায় তাদের অনেকের ভোগান্তির কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে। অনেক শিক্ষকই এই সুযোগে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
আবেদনকারী শিক্ষক প্রথমে নিজের স্থায়ী বা চাকরির আবেদনে উল্লেখ করা নিজ জেলার শূন্যপদের জন্য আবেদন করতে পারবেন। নিজ জেলায় পদ শূন্য না থাকলে একই বিভাগের অন্য জেলার শূন্যপদের বিপরীতে আবেদন করা যাবে। এছাড়া স্বামী বা স্ত্রীর নিজ জেলা কিংবা কর্মস্থল জেলায় বদলির আবেদন করা যাবে, তবে স্বামী বা স্ত্রীর কর্মস্থল সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান হতে হবে। একজন শিক্ষক পছন্দের ক্রমানুসারে সর্বোচ্চ তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম আবেদনে উল্লেখ করতে পারবেন।
একটি শূন্যপদের বিপরীতে একাধিক আবেদন পড়লে নীতিমালা অনুযায়ী নারী শিক্ষক, স্বামী বা স্ত্রীর কর্মস্থল এবং চাকরির জ্যেষ্ঠতাসহ নির্ধারিত বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে। প্রতিযোগী আবেদনকারীদের কর্মস্থল একই বা ভিন্ন উপজেলা কিংবা জেলায় হলে বর্তমান কর্মস্থল থেকে কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থলের দূরত্বও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পদ্ধতি অনুযায়ী বিবেচনা করা হবে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বছরে সর্বোচ্চ দুজন শিক্ষক বদলির সুযোগ পাবেন, তবে একই বিষয়ে একাধিক শিক্ষককে বদলি করা যাবে না।
বদলির ফলে শিক্ষকের এমপিও, অন্যান্য আর্থিক সুবিধা এবং চাকরির জ্যেষ্ঠতার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, তবে কোনো শিক্ষক টিএ/ডিএ ভাতা পাবেন না। বদলির আদেশ প্রকাশের ১০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষককে অবমুক্ত বা ছাড়পত্র নিশ্চিত করতে হবে এবং পরবর্তী ১০ দিনের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। অবমুক্তি থেকে নতুন কর্মস্থলে যোগদান পর্যন্ত সময় কর্মকাল হিসাবে গণ্য হবে। নতুন কর্মস্থলে যোগদানের তথ্য প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে অনলাইনে মাউশির মহাপরিচালক ও এনটিআরসিএর চেয়ারম্যানকে জানাতে হবে।
ভুল, অসত্য বা অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়ে আবেদন করা হলে তা বাতিল করা হবে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এছাড়া কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্টপ পেমেন্ট, সাময়িক বরখাস্তের আদেশ বা ফৌজদারি মামলা চলমান থাকলে তিনি বদলির জন্য যোগ্য হবেন না। অনেক শিক্ষক এখনো ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে মাউশিতে আলোচনা হয়েছে, তবে এই বদলির আগে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে না বলে পরবর্তী বদলির সময়ে তারা আবেদন করতে পারবেন।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, দীর্ঘদিন ধরে দূর-দূরান্তে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ২১ আগস্ট থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন নেওয়া হবে এবং এই কার্যক্রম শেষ করার পর নতুন শিক্ষক নিয়োগের দিকে নজর দেওয়া হবে।