নতুন শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্রে পরিকল্পিত কারসাজি ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) একশ্রেণির কর্মকর্তা ও প্রেস মালিকদের যোগসাজশে দরপত্রের প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ নির্দিষ্ট চক্রের হাতে চলে গেছে। এতে সরকারের আনুমানিক ৩০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। এসব দুর্নীতির তথ্যের ভিত্তিতে এনসিটিবি কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র উদ্ধার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দরপত্রের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যবই মুদ্রণ ও সরবরাহের জন্য ঘোষিত ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে ৩০টিতেই কেবল একজন করে দরদাতা প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। ১৩টি দরপত্রে দুটি এবং বাকি দুটি দরপত্রে তিনটি করে প্রস্তাব পড়েছিল। এছাড়া প্রাক্কলিত দরপত্র চলাকালে নিয়মবহির্ভূতভাবে দর বাড়ানো হয়েছে। গত ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে যেখানে মাধ্যমিক স্তরের বইয়ে ফর্মাপ্রতি গড় মুদ্রণমূল্য ছিল ২ টাকা ৩১ পয়সা, এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৩২ পয়সা, যা প্রায় ৪৩.৭ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান জানান, এবার প্রতিযোগিতাহীন দরপত্রের মাধ্যমে এনসিটিবি ও কিছু প্রেস মালিক মিলে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে, যেখানে স্বচ্ছতা ও সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে।
এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের পেছনে মুদ্রণশিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাওসারুজ্জামান রুবেল, প্রেস মালিক দুলাল সরকার, এসএিম মহসিন, মিন্টু মোল্লা, হুমায়ুন কবির, শেখ সিরাজ, পারভেজ ও সুহেলের নাম উঠে এসেছে। চক্রটি এনসিটিবির প্রায় হাজার কোটি টাকার কাজ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। যদিও প্রমা ও ব্রাইট প্রিন্টিং প্রেসের মালিক এসএম মহসিন সিন্ডিকেটের দাবি অস্বীকার করে বলেন, তিনি অনিয়মের কিছু জানেন না এবং খুব বেশি কাজ পাননি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তিনি একাই প্রায় ১২০ কোটি টাকার কাজ পেয়েছেন। অন্যদিকে প্রাথমিক স্তরের ৩৩৭ ও ৪০৪ নম্বর লট এবং মাধ্যমিকের ৬৭১ নম্বর লটে কাওসারুজ্জামান রুবেলের অগ্রণী ও কর্ণফুলী প্রেস সমঝোতার মাধ্যমে উচ্চ দরে প্রায় তিন কোটি বই ছাপানোর কাজ বাগিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু, সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রেস চক্রটিকে সহায়তার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোটি টাকার বিনিময়ে শিক্ষা প্রশাসনের উচ্চপর্যায়কে প্রভাবিত করে পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো এবং গোপনে প্রাক্কলিত দর ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে সদস্য টুকুর বিরুদ্ধে। যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাউলা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, সময়মতো বই পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে এবং আনীত অভিযোগগুলো সত্য নয়।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই ছাপাতে সরকারের প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে, যা গত বছরের এক হাজার ৬০০ কোটি টাকার চেয়ে অনেক বেশি। চুক্তি অনুযায়ী ৪০ দিনের মধ্যে ৫০ শতাংশ বই সরবরাহের নিয়ম থাকলেও ইনস্পেকশন এজেন্টদের তথ্য মতে শনিবার পর্যন্ত একাধিক প্রেস বই সরবরাহ করতে পারেনি। উলটো সময়সীমার বাধ্যবাধকতা তুলে দিতে প্রেস চক্রটি এনসিটিবিকে চাপ দিচ্ছে। সম্প্রতি অনিয়মের ব্যাপক সমালোচনার পর চলতি মাসে নতুন পাঁচটি লটে (৯২১, ৯৩২, ৯৪৫, ৯৪৭ ও ১০১২) ৩১ থেকে ৩৪টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়, যা আগের দরপত্রে প্রতিযোগিতার অভাবকে স্পষ্ট করে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি তদারকি বাড়িয়েছে; শিক্ষামন্ত্রী কয়েকটি প্রেস পরিদর্শন ও বৈঠক করেছেন এবং নিম্নমানের বই ছাপার অভিযোগে ২০টিরও বেশি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।