দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্লু-চিপ সূচক ডিএস৩০-এর সর্বশেষ পুনর্বিন্যাস নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। বিশেষ করে টানা তিন বছর লোকসানে থাকা এবং লভ্যাংশ প্রদান করতে না পারায় বর্তমানে জেড ক্যাটাগরিতে থাকা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর অন্তর্ভুক্তি বিনিয়োগকারীদের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আগামী ১৯ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নতুন সূচকে পাওয়ার গ্রিডের পাশাপাশি বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস (বিএসআরএম) এবং দ্য একমি ল্যাবরেটরিজ যুক্ত হয়েছে। একই সময়ে কোহিনূর কেমিক্যাল (বাংলাদেশ), ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস এবং লিন্ডে বাংলাদেশ সূচক থেকে বাদ পড়েছে।
কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে তাদের নিট লোকসান ছিল ৬২৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কিছুটা কমে ৬১০ কোটি ৯১ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোকসান আরও কমে ২১০ কোটি ৬২ লাখ টাকায় নেমেছে। লোকসান থাকলেও কোম্পানির ব্যবসায়িক পরিধি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। গত তিন বছরে রাজস্ব ২ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এছাড়া কোম্পানির মোট সম্পদের পরিমাণ বেড়ে ৮০ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা হয়েছে এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) ১১৬ টাকা ১৪ পয়সা থেকে বেড়ে ১৩৯ টাকা ২৯ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে কোম্পানিটির বাজার মূলধন প্রায় ৩ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা এবং ফ্রি-ফ্লোট বাজার মূলধন ৭১৩ কোটি টাকা। ২০২০ ও ২০২১ সালে ২০ শতাংশ এবং ২০২২ ও ২০২৩ সালে ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিলেও পরবর্তীতে তা বন্ধ হওয়ায় কোম্পানিটি জেড ক্যাটাগরিতে নেমে যায়।
তবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে কোম্পানিটি পুনরায় মুনাফায় ফিরেছে। প্রথম প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ৩ টাকা ৯৮ পয়সা, যা দ্বিতীয় প্রান্তিক শেষে ৫ টাকা ২২ পয়সা এবং তৃতীয় প্রান্তিকে ৬ টাকা ২৪ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। ডিএসইর মতে, আয় বৃদ্ধি, ব্যয় সংকোচন এবং নগদ অর্থ আদায় বাড়ার কারণে আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে, যার ভিত্তিতেই এই সূচকে অন্তর্ভুক্তির যোগ্যতা অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ডিএসইর উপমহাব্যবস্থাপক ও মুখপাত্র শফিকুর রহমান জানান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সূচকে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে ক্যাটাগরি কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। তিনি বলেন, পাওয়ার গ্রিড ডিএস৩০ সূচকের জন্য নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করেছে এবং সর্বশেষ তিন প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল ইতিবাচক ছিল। সূচক নীতিমালার মধ্যে ফ্রি-ফ্লোট বাজার মূলধন, তারল্য, নিয়মিত লেনদেন এবং ১২ মাসের আর্থিক পারফরম্যান্স বিবেচনা করা হয়।
এই অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বাজার সংশ্লিষ্টরা ভিন্নমত পোষণ করেছেন। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, পাওয়ার গ্রিড ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী হলেও লভ্যাংশ প্রদান শুরু না করা পর্যন্ত একে পুরোপুরি মৌলভিত্তিসম্পন্ন বলা কঠিন। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ড. আল-আমিন বলেন, ব্লু-চিপ সূচকে সাধারণত জেড ক্যাটাগরির কোম্পানি থাকার কথা নয়। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের কথা বলা হলে তা সব ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। ধারাবাহিকভাবে লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ কোম্পানির সূচকে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ডিএসইর আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।