কিশোরগঞ্জে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফরকে কেন্দ্র করে বাজিতপুর-নিকলী (কিশোরগঞ্জ-৫) আসনের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। সফরের দিন এলাকায় ছিলেন না স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান। অন্যদিকে, সফরের পথে বিএনপিতে যোগ দেওয়া সৈয়দ এহসানুল হুদাকে নিজের গাড়িতে তুলে নেন প্রধানমন্ত্রী। এই ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে আলোচনা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ শুরু হয়েছে।
স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বাজিতপুরে বিএনপির রাজনীতি মূলত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন দল থেকে বহিষ্কৃত উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও বর্তমান সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান। অন্য পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন একই আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সৈয়দ এহসানুল হুদা। ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর নিজের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয় দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন এহসানুল হুদা। পরে তাঁকে এই আসনে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়, যদিও এর আগে শেখ মজিবুর রহমানকে প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল।
চূড়ান্ত মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন শেখ মজিবুর রহমান। নির্বাচনে তিনি ধানের শীষের প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদাকে ১৩ হাজার ১৫৪ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণে চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি শেখ মজিবুর রহমানকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে তাঁর পক্ষে অবস্থান নেওয়া বাজিতপুর ও নিকলী উপজেলার ৮৩ জন নেতাকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে বহিষ্কৃত হলেও শেখ মজিবুর রহমান ও তাঁর অনুসারীরা স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং উপজেলা বিএনপির ব্যানারে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন।
গত ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কিশোরগঞ্জ সফরকে ঘিরে দুই পক্ষের তৎপরতা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। উভয় পক্ষই একাধিক প্রস্তুতি সভা করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করে। শেখ মজিবুর রহমানের অনুসারীদের মধ্যে গুঞ্জন ছিল, সফরের দিন মজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর মঞ্চে থাকবেন এবং এহসানুল হুদা থাকবেন নিচে। এমনকি বহিষ্কৃত নেতাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়েও ইতিবাচক কোনো বার্তা আসতে পারে বলে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। তবে সফরের আগের রাতে পরিস্থিতি বদলে যায়। ১৫ আগস্ট রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে যে শেখ মজিবুর রহমান অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। পরে জানা যায়, হৃদ্রোগজনিত সমস্যার চিকিৎসার জন্য ওই রাতেই তিনি সিঙ্গাপুরে চলে গেছেন। ফলে ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে তাঁকে দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির পুরো সময় বাজিতপুরের রাজনীতিতে এহসানুল হুদার অনুসারীদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যায়। একই রঙের গেঞ্জি ও টুপি পরে তাঁরা সকাল থেকেই কটিয়াদী এলাকায় অবস্থান নেন। আগের প্রস্তুতি সভাগুলোতে শেখ মজিবুর রহমান পক্ষের বড় ধরনের শোডাউনের কথা বলা হলেও সেদিন তাঁদের দলগতভাবে তেমন দেখা যায়নি। সফরের পথে এহসানুল হুদাকে দেখতে পেয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁর গাড়ি থামান এবং তাঁকে নিজের গাড়িতে তুলে নেন। সেই মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বাজিতপুরে বিএনপির বিভক্ত রাজনীতিতে বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়।
এই ঘটনাকে এহসানুল হুদার অনুসারীরা দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তাঁর অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। বাজিতপুর পৌর বিএনপির সভাপতি এহসান কুফিয়া বলেন, "ওরা বলেছিল, ওরা মঞ্চে থাকবে। কিন্তু জনগণ কী দেখল? জনগণ দেখল, ওরা নেই, আমরা আছি। শুধু তা-ই নয়, প্রধানমন্ত্রী ডাক দিয়ে এহসানুল হুদাকে গাড়িতে তুলে নিয়েছেন। এটা শুধু গাড়িতে ওঠার ঘটনা নয়; বাজিতপুর-নিকলীর বিএনপির রাজনীতির জন্য এটি বড় বার্তা।" তবে শেখ মজিবুর রহমানের অনুসারীরা ঘটনাটিকে এভাবে দেখছেন না। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে তাঁর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় বহিষ্কৃত হওয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান জানান, শেখ মজিবুর রহমানের হৃদ্রোগের সমস্যা রয়েছে। হঠাৎ ব্যথা অনুভব করায় চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুর যেতে হয়েছে। তিনি বলেন, "রোগশোক তো বলেকয়ে আসে না। আর প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে কারও স্থান পাওয়া মানে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে চলে যাওয়া নয়। যাঁরা বিষয়টিকে বড় করে দেখছেন, তাঁরা স্থানীয় রাজনীতির হিসাব ভুল করছেন।" শেখ মজিবুর রহমানের অসুস্থতা নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়া ও ট্রল করাকে রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে তাঁদের পক্ষের নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি কম থাকার বিষয়ে মনিরুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁর কোনো কর্মসূচিতে বিশৃঙ্খলা চান না। জেলার নেতাদের মাধ্যমে নেতা-কর্মীদের সংযত থাকতে বলা হয়েছিল। বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার সময়ের ব্যাপার বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান অবশ্য কোনো পক্ষের সঙ্গে নেই। তিনি আলাদাভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করেন। তিনি বলেন, "একজনকে গাড়িতে ওঠানো, অন্যজন দেশের বাইরে চলে যাওয়া—ঘটনা দুটি বাজিতপুরে বিএনপির রাজনীতির বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে আমার মতে, আমরা এখন বড় ধরনের দলীয় বিশৃঙ্খলার মধ্যে আছি।" কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম বাজিতপুরের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে চিকিৎসা শেষে গত বুধবার দেশে ফিরেছেন শেখ মজিবুর রহমান। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটও দেন তিনি। ভোট শেষে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর সামনে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। নবনির্বাচিত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর পাশে ফুলের তোড়া নিয়েও তাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। পাশে ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মঈন খান। এসব ছবি মজিবুর রহমানের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। অন্যদিকে, সৈয়দ এহসানুল হুদাও রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে রুহুল কবির রিজভী ও আন্দালিভ রহমান পার্থের পাশে দাঁড়ানো তাঁর ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বাজিতপুরের কয়েকজন নেতা-কর্মীর ভাষ্য, স্থানীয় রাজনীতির দুই পক্ষের দুই নেতার কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কার কতটা ঘনিষ্ঠতা, এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি দিয়েই তার হিসাব কষা হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতি অনেকটাই কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বাইরে গিয়ে ‘কার সঙ্গে কার ছবি’—এই আলোচনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।