আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) নিয়োগ পাওয়া ২৫৭ জন প্রকৌশলীকে ঘিরে গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত এই প্রকৌশলীদের নিয়মিতকরণ, পিএসসির সুপারিশ, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং চাকরির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তাদের জ্যেষ্ঠতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্তে এসব অনিয়ম চিহ্নিত হওয়ার পরও তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সর্বশেষ ২০০৮ সালে এলজিইডির প্রথম শ্রেণির প্রকৌশলীদের অনুমোদিত জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। দীর্ঘ ১৮ বছর পর নতুন খসড়া তালিকা প্রকাশের পর বিষয়টি ফের সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিতকরণ না হওয়া ২৫৭ প্রকৌশলীকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে জ্যেষ্ঠতার সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে নিয়ম মেনে চাকরি করা প্রকৌশলীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সূত্র জানায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আগেই মত দিয়েছিল যে, নিয়মিতকরণ যথাযথ হয়েছে কি না তা নিশ্চিত না হয়ে জ্যেষ্ঠতার তালিকা করা উচিত নয়। তবে সেই মতামত উপেক্ষা করে স্থানীয় সরকার বিভাগ ২১ এপ্রিল খসড়া তালিকা প্রকাশ করে। এরপর মাত্র চার দিনের মাথায় ২৬ এপ্রিল তালিকা চূড়ান্ত করতে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ এবং সমন্বয়ক এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন। কমিটি শুনানি সম্পন্ন করে ১৭ আগস্ট তালিকা চূড়ান্ত করার বিষয়ে সভা করেছে।
তদন্ত নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১০ সালে ১৩১ জন, ২০১১ সালে ১০৯ জন এবং ২০১৩ সালে ১৭ জন প্রকৌশলীকে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে পদায়ন করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুযায়ী, পিএসসির সুপারিশ ছাড়া প্রথম শ্রেণির পদে নিয়োগের সুযোগ নেই। অথচ এই ২৫৭ জনের ক্ষেত্রে পিএসসির কোনো সুপারিশ নেওয়া হয়নি। এছাড়া অনিয়মিত এই ২৫৭ জনের মধ্যে অন্তত ৪২ জনের প্রকল্পের চাকরিতে ধারাবাহিকতা ছিল না, যার মধ্যে ২০ জনকে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় রাখা হয়েছে। নিয়মিতকরণ না হওয়া ২১২ জনকেও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূতাপেক্ষ তারিখ থেকে নিয়মিত করার সুযোগ না থাকায় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে নিয়মিতকরণের আদেশ জারি করা প্রয়োজন। কমিটি তাদের সপ্তম গ্রেডে সিলেকশন গ্রেড এবং ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়ার আইনগত সুযোগ ছিল না বলেও মত দিয়েছে। এছাড়া শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তালিকার ৩৭৬ ও ৪৭১ নম্বর সিরিয়ালের প্রকৌশলী প্রকল্পে যোগদানের সময় বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারী ছিলেন না। এছাড়া ৩৩৮, ৩৪০, ৩৪১, ৩৪৭ ও ৩৫১ নম্বর সিরিয়ালের পাঁচজনের নিয়োগ বিধিমালা-২০০৯ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছিল না। কৃষি ও যান্ত্রিক প্রকৌশল শাখার পাঁচজনকেও পুরকৌশলের সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগ ২০২২ সালের ২৬ অক্টোবর স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, সহকারী প্রকৌশলী পদটি নবম গ্রেডের হওয়ায় নিয়মিতকরণের ক্ষেত্রে পিএসসির পরামর্শ বাধ্যতামূলক। কিন্তু এলজিইডির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী ২০২২ সালের ২৯ আগস্ট তথ্য অধিকার আইনে আবেদনের জবাবে স্বীকার করেন যে, পিএসসির অভিমত গ্রহণ করা হয়নি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘শূন্য পদে চলতি দায়িত্ব প্রদান সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৩’-এর ৮(৮) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রকল্প থেকে আসা কোনো কর্মকর্তাকে রাজস্ব বাজেটে নিয়মিতকরণ না হলে চলতি দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। নিয়মিতকরণের সঙ্গে জ্যেষ্ঠতার প্রশ্ন জড়িত থাকায় ভূতাপেক্ষ তারিখ থেকে নিয়মিতকরণ ও জ্যেষ্ঠতা গণনার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এ বছরের এপ্রিল ও মে মাসে দুই দফায় অনিয়মিত ১৮০ জনকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তড়িঘড়ি করে পিএসসির মতামত নেওয়ার চেষ্টা চললেও, ভূতাপেক্ষ নিয়মিতকরণের মাধ্যমে জ্যেষ্ঠতা গণনার সুযোগ নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।