যুদ্ধটি দ্রুত শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ছয় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও ইরানকে নত করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ব্যাপক বিমান হামলায় ইরানের সামরিক অবকাঠামোতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা নিহত হয়েছেন। তা সত্ত্বেও ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি এবং জনগণও সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নামেনি। বরং ইরানের সামরিক বাহিনী তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা পুনরায় সচল করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
সামরিক যুদ্ধের জায়গা এখন নিয়েছে অর্থনৈতিক যুদ্ধ। ওয়াশিংটনের নতুন লক্ষ্য ইরানের অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলা, যাতে অর্থনৈতিক সংকটে সাধারণ মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই কৌশলও যুক্তরাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আনতে পারে। চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল সরাসরি মূল্যায়ন করেছেন যে, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিভাগের প্রধান সুজান ম্যালোনিও মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যাপক ক্ষতি করলেও ইরান আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে বেরিয়ে এসেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর দিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আপনাদের স্বাধীনতার সময় ঘনিয়ে এসেছে।’ ছয় মাস পর তার প্রশাসন এখন ইরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ আরোপ করছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই হিসাব মেলেনি। ইরানের নেতৃত্ব বরং আরও কঠোর হয়েছে এবং সামরিক কর্মকর্তাদের প্রভাব বেড়েছে। শাসকেরা নিজেদের টিকে থাকাকেই দেশের টিকে থাকা হিসেবে দেখছেন এবং সামান্যতম ভিন্নমতও কঠোর হাতে দমন করা হচ্ছে। ফলে ট্রাম্পের ‘স্বাধীনতা’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এখন অনেকটাই ফাঁপা শোনাচ্ছে।
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক যৌথ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হন এবং তার ছেলে ও বর্তমান উত্তরসূরি সাইয়েদ মুজতবা খামেনি গুরুতর আহত হন। কয়েক সপ্তাহের তীব্র বোমাবর্ষণে ইরানের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয় এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু এতেও সরকারের পতন হয়নি। গত সোমবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট ব্যাসেন্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণা করেন। এর লক্ষ্য ইরানকে আরও বিচ্ছিন্ন করা এবং দেশটির ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেওয়া। ব্যাসেন্ট বলেন, ইরানের ‘প্রতিটি শেষ বিকল্প’ বন্ধ করাই এই অভিযানের লক্ষ্য।
তবে এখানেই বড় প্রশ্ন—এর শেষ কোথায়? যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের সরকার পতন চায়, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে তেহরানকে বাধ্য করতে চায়, নাকি অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে চায়? লন্ডনভিত্তিক বোরস অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের গবেষক এসফানদিয়ার বাটমাঙ্গেলিজদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য স্পষ্ট নয়। ইরানকে ক্ষতি করার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের থাকলেও সেই ক্ষতি থেকে আত্মসমর্পণ বা সরকার পতনের পথটি স্পষ্ট নয় বলে মনে করেন সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির গবেষক সিনা তুসি।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজ জানান, ইরানের নেতৃত্ব জানতে চাইছে—যুক্তরাষ্ট্র কি পতন চায়, আত্মসমর্পণ চায়, নাকি সমঝোতা? ইরান মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধকে যুদ্ধেরই আরেক রূপ হিসেবে দেখছে। নতুন মার্কিন কৌশলে দুটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। চাপ ব্যর্থ হলে ওয়াশিংটন আবার সামরিক পথে ফিরতে পারে। আর চাপ সফল হলে ইরান মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙতে আরও বড় পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুদ্ধ শেষ করার অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় তেহরানের অবস্থান কঠোর। ইরান অন্তত জুনের সমঝোতা স্মারকে ফিরতে চায়, যাতে ট্রাম্পও স্বাক্ষর করেছিলেন। তবে ট্রাম্প এখন সেটিকে ‘শেষ’ বলে ঘোষণা করেছেন। হরমুজ প্রণালি নিয়েও ইরান ও ওমান আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু অর্থনীতি বিপর্যস্ত হলেও হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি নয় ইরানের নেতৃত্ব।
এই মুহূর্তে সংঘাত অনেকটা স্থবির। দুই পক্ষ সরাসরি একে অপরের ওপর হামলা চালাচ্ছে না এবং হরমুজ প্রণালির দুই দিকের অবরোধও তুলনামূলকভাবে শিথিল। এই অবস্থাকে একধরনের ‘ভুয়া যুদ্ধ’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের ইরান-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এলি গেরানমায়েহ সতর্ক করেছেন, দুই পক্ষই যদি ধরে নেয় যে অন্য পক্ষের সঙ্গে কোনো চুক্তি সম্ভব নয়, তাহলে সংঘাত আবার সামরিক পথে গড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জেরেমি শাপিরোও প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্প কেন এই দীর্ঘ ও দেশে অজনপ্রিয় যুদ্ধ শেষ করার কোনো পথ বেছে নিচ্ছেন না। ছয় মাসের এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত একটি কঠিন সত্যই সামনে এনেছে—যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ইরানকে আঘাত করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু তাকে নত করার পথ নেই।
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯: ২৩আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯: ৩৩