যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর ওয়াশিংটনে ইসরাইলের অবস্থান আরো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতিকে দায়ী করছেন খোদ দলটির একাধিক নেতা। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, মার্কিন অর্থনীতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইসরাইলের প্রতি ওয়াশিংটনের একতরফা সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন ভোটারদের অসন্তোষের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস—উভয় রুমেই ডেমোক্র্যাটরা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে। পরাজয়ের পর রিপাবলিকান শিবিরে শুরু হয়েছে তীব্র পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, ‘আমাদের পরাজয়ের প্রকৃত কারণ প্রায় সবার কাছেই স্পষ্ট।’ তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে, যা ভোটারদের ক্ষুব্ধ করে তোলে।
গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান এবং দক্ষিণ লেবাননে উপস্থিতি বজায় রাখতে ওয়াশিংটনের অর্থায়ন নিয়ে আগে থেকেই মার্কিন ভোটারদের বড় একটি অংশ ক্ষুব্ধ ছিল। অনেক ভোটারের মতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্প প্রশাসনকে প্রভাবিত করেছিলেন। সে সময় কোনো স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন ছাড়াই ইসরাইল দাবি করেছিল, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
ভ্যান্সের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে যেসব ভোটার দল পরিবর্তন করেছেন, তাদের ওপর পরিচালিত জরিপে রিপাবলিকানদের সমর্থনে ফেরার জন্য চারটি শর্ত উঠে এসেছে—ইরানের যুদ্ধ বন্ধ করা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে ফেরা এবং ইসরাইলের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্কের মৌলিক সংস্কার করা। তবে এসব দাবি ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির বিপরীত। নির্বাচনি প্রচারের সময় ট্রাম্প বিদেশের যুদ্ধে মার্কিন সম্পৃক্ততা কমানো ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) জরিপ অনুযায়ী, প্রতি ১০ জন ভোটারের প্রায় ৬ জন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার মার্কিন সিদ্ধান্তকে ভুল বলে মনে করেন। পাশাপাশি, নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয়কে সবচেয়ে বড় ইস্যু হিসেবে দেখেছেন সিংহভাগ ভোটার। লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের গবেষক অ্যান্ড্রু পেইন আলজাজিরাকে জানান, সাধারণ ভোটাররা হয়তো যুদ্ধের সূক্ষ্ম কৌশল নিয়ে ভাবেননি, তবে তারা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ বাড়ার সঙ্গে এই যুদ্ধের সরাসরি সম্পর্ক দেখতে পেয়েছেন এবং রিপাবলিকানদের ভোটের মাধ্যমে শাস্তি দিয়েছেন।
ইসরাইলবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে এবার ঐতিহাসিক জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ। মিশিগান অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের জোরালো প্রচার ও প্রভাবশালী ইসরাইলপন্থি লবিগোষ্ঠী আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (এআইপ্যাক) বিপুল অর্থ খরচের পরও তিনি সিনেটর নির্বাচিত হন। আল-সাইয়েদ যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের সামরিক সহায়তা অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিজয়ের পর তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না আমাদের অর্থ বর্ণবাদী ব্যবস্থা, গণহত্যা কিংবা যুদ্ধে ব্যবহৃত হোক।’ তার এই জয় সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হিসেবে ইতিহাস তৈরি করল।
রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এআইপ্যাকের সুপার পিএসি ‘ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট’ (ইউডিপি) ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক কমিটিগুলো এবারের নির্বাচনে ৮ কোটি ৪১ লাখ ডলার ব্যয় করে। তবে এর মধ্যে ৫ কোটি ৫৩ লাখ ডলারই গেছে পরাজিত প্রার্থীদের পেছনে। বিশেষ করে মিশিগানে আল-সাইয়েদকে হারাতে ইউডিপি প্রাথমিক ও মূল নির্বাচন মিলিয়ে ৩ কোটি ১৪ লাখ ৭০ হাজার ডলার খরচ করেও ব্যর্থ হয়। ২০২২ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে যেখানে এআইপ্যাক সমর্থিত প্রার্থীদের জয়ের হার ছিল যথাক্রমে ৬৯ ও ৮৭ শতাংশ, এবার সেখানে লবিগোষ্ঠীটিকে বড় ধাক্কা খেতে হয়েছে।
তবে এআইপ্যাক বুধবার রাতে দাবি করে, তাদের সমর্থিত ২৩৪ জনের বেশি প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। একইসঙ্গে সংগঠনটি ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার ও হাকিম জেফরিসকে অভিনন্দন জানিয়ে দুই দলের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখার বার্তা দিয়েছে। সামনের নির্বাচনগুলোতে নিজেদের রাজনৈতিক তৎপরতা আরো বাড়ানোর কথা জানিয়েছে তারা।
নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক ঝুঁকি টের পেয়ে ট্রাম্প এক বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এই বছরের পর ইসরাইলকে দেওয়া বার্ষিক সামরিক সহায়তা বন্ধ করা হতে পারে। বর্তমানে কার্যকর চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইসরাইল প্রতিবছর ৩৮০ কোটি ডলার মার্কিন সামরিক সহায়তা পাওয়ার কথা। যদিও অস্ত্র বিক্রি চালু রাখার কথা বলে ট্রাম্প কীভাবে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সহায়তা বন্ধ করবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় গাজায় মার্কিন অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে কঠোর তদন্ত ও শুনানির সুযোগ তৈরি হলো। বাইডেন ও ট্রাম্প প্রশাসন এসব অস্ত্রের ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে কী জানত, তা খতিয়ে দেখতে পারেন আইনপ্রণেতারা। অতীতেও এমন পদক্ষেপের আভাস পাওয়া গেছে; ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইসরাইলের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন তলবের প্রস্তাবে ১১ জন সিনেটর, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের প্রাথমিক প্রস্তাবে ২৭ জন সিনেটর এবং এই বছরের এপ্রিলে ইসরাইলে সামরিক বুলডোজার ও এক হাজার পাউন্ডের বোমা বিক্রির বিরোধিতায় যথাক্রমে ৪০ ও ৩৬ জন সিনেটর ভোট দিয়েছিলেন।
তবে কোনো নতুন আইন বা অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব কংগ্রেসে পাস হলেও ট্রাম্পের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা সেটি আটকে দিতে পারে। মঙ্গলবার ফক্স নিউজকে ট্রাম্প নিশ্চিত করেন যে, ডেমোক্র্যাটদের উদ্যোগ রুখতে তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভেটো প্রয়োগ করবেন। এই ভেটো বাতিল করতে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন, যা ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে অর্জন করা বেশ কঠিন। ইউএসএমইপির প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল লেভি মনে করেন, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন তাদের নির্বাহী ক্ষমতার এমন ব্যবহার করছে, যা শাসন ব্যবস্থার প্রচলিত ক্ষমতার ভারসাম্যকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
অন্য বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন রাজনীতিতে নীতিগত পরিবর্তন এলেও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিনের সামরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা সম্পর্ক রাতারাতি ভেঙে ফেলা সহজ নয়। ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক সাইমন ম্যাবন বলেন, ইসরাইলের প্রতি মার্কিন জনসমর্থন কমার বিষয়টি ডেমোক্র্যাটদের জন্য রাজনৈতিক হাতিয়ার হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের কারণে তাদের পদক্ষেপের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকবে।
অন্যদিকে, কৌশল হিসেবে ইসরাইলপন্থি লবিগোষ্ঠীগুলো ইসরাইলের সামগ্রিক নীতির দায় এড়াতে নেতানিয়াহু এবং সরকারের উগ্র ডানপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন গভির ও বেজালেল স্মতরিচের ওপর নজর দেওয়ার চেষ্টা করছে। ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদ এক্সে লিখেছেন, মার্কিন ভোটাররা মূলত উগ্রপন্থি মন্ত্রী, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও নেতানিয়াহুর একপেশে অবস্থানের বিরোধিতা করছেন, পুরো ইসরাইলের নয়। তিনি ইসরাইলের পরবর্তী সরকারকে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় দলের সঙ্গে আলোচনার পরামর্শ দেন। তবে ড্যানিয়েল লেভির মতে, ভোটাররা বিশ্বস্তভাবে মনে করেন ইরানের সংঘাতের পেছনে নেতানিয়াহু সরকারের ভূমিকা ছিল, ফলে মার্কিন মূলধারার রাজনীতিতে ইসরাইলনীতির তীব্র সমালোচনা এখন স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।