বাংলাদেশে হামের পাশাপাশি ডেঙ্গু সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৬৮৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময় সপ্তাহে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে, অর্থাৎ দৈনিক গড়ে পাঁচজন করে মারা গেছেন। এরই মধ্যে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, দেশে ডেঙ্গুর নতুন ধরন ‘ডেন-৩ সেরোটাইপ’ ছড়িয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এএমএ মুহিত সতর্ক করে বলেছেন, এখনই সচেতন না হলে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
আইইডিসিআর-এর তথ্যমতে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর দেশে ‘ডেন-২’ ধরনের আধিপত্য ছিল। তবে ২০২৬ (2026) সালে ডেন-২ এর পাশাপাশি ডেন-৩ ধরনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রতি পাহাড়ি ও উপকূলীয় অঞ্চলে চালানো এক জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে। গত জুনে বান্দরবান, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তদের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বরগুনা ও পটুয়াখালীর শহরাঞ্চলে প্রধানত ডেন-৩ ধরনের সংক্রমণ ঘটেছে। তবে এই দুই জেলার গ্রামাঞ্চলে এবং পার্বত্য জেলা বান্দরবানে ডেন-২ ধরনের রোগী বেশি পাওয়া গেছে।
ঢাকার পরিস্থিতি নিয়ে আইইডিসিআর-এর মেডিকেল অফিসার ডা. আব্দুল্লাহ ওমর নাসিফ জানান, ডেঙ্গু মৌসুমের শুরুতে তারা বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে এনএস-১ পজিটিভ রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে সেরোটাইপিং করেন। ঢাকার ভেতর জুলাইয়ের শেষ ও আগস্টের শুরুতে সংগৃহীত ৭১টি নমুনার মধ্যে ৬৫টিতেই ডেঙ্গুর ডেন-৩ ধরন শনাক্ত হয়েছে, যা মোট নমুনার প্রায় ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ। বাকি নমুনাগুলোতে ডেন-২ ধরন পাওয়া গেছে।
ডেঙ্গুর এই দেশব্যাপী বিস্তারের বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার জানান, ডেঙ্গু এখন আর কেবল শহরকেন্দ্রিক রোগ নয়। অপরিকল্পিত নগরায়ন, ক্যান ও প্যাকেটজাত খাবারের যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা এবং পানি সংকটের কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমিয়ে রাখার অভ্যাস এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি করছে। ফলে গ্রাম, পাহাড় ও উপকূলীয় অঞ্চলেও এই রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। পাহাড়ি অঞ্চলে সুপারি গাছ কাটার পর গর্তে জমে থাকা পানি, ওয়ানটাইম প্লাস্টিক কাপ ও বিভিন্ন প্লাস্টিকসামগ্রী এডিস মশার বংশবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৫৮ জন। নতুন রোগীদের মধ্যে বরিশাল বিভাগে ১৩৭ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬৯ জন, ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরে ৩১৬ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৯৩ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নির্ধারণ করা ১৪৮ জন, খুলনা বিভাগে ৩৩৪ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৮৪ জন, রাজশাহী বিভাগে ১১২ জন, রংপুর বিভাগে ৫৭ জন এবং সিলেট বিভাগে নয়জন ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছর এ পর্যন্ত ৩৯ হাজার ৪৭৯ জন রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন এবং বর্তমানে ১ হাজার ৩০০ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, গত দুই সপ্তাহে ডেঙ্গু সংক্রমণ আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে কিছুটা বাড়লেও মৃত্যুর হার এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দিতে স্বাস্থ্য বিভাগ সক্ষম। তবে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় চিকিৎসায় যেন কোনো ঘাটতি না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা হচ্ছে।
can অন্যদিকে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এএমএ মুহিত। রোববার বিকেলে জাতীয় সংসদের টানেলে এক ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, সোমবার থেকে মাঠপর্যায়ে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। তাই অক্টোবরের আগেই সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
২৪ ঘণ্টায় আরও চার মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৫৫৮ * সতর্ক না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে : স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী
দেশে হামের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু সংক্রমণ। সরকারের হিসাব মতে, চলতি সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজারের বেশি (১৬৮৬) ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময় ২০ জন অর্থাৎ ডেঙ্গুতে দৈনিক গড়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যেই ডেঙ্গুর নতুন ধরন ‘ডেন-৩ সেরোটাইপ’ সংক্রামিত হওয়ার দুঃসংবাদ দিয়েছে সরকারের ‘রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)।’ এই অবস্থায় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এএমএ মুহিত বলেছেন, সতর্ক না হলে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।