ডেঙ্গুর প্রকোপ কোনোভাবেই কমছে না, বরং বছরজুড়েই এই মশাবাহিত রোগের বিস্তার জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে ধারণা করা হতো বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর চিত্র বলছে এটি এখন আর কোনো নির্দিষ্ট ঋতুর রোগ নয়। সারাবছরই মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এ অবস্থায় ডেঙ্গু মোকাবিলায় মৌসুমভিত্তিক তৎপরতার পরিবর্তে বছরব্যাপী সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ৪১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৬৩৩ জন এবং বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ৬ হাজার ২৩৬ জন। এই পরিসংখ্যান কেবল রোগের বিস্তারই নয়, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপের ইঙ্গিতও দেয়। মাসের ভিত্তিতে মৃত্যুর চিত্র আরও উদ্বেগজনক; বছরের প্রথমার্ধের তুলনায় দ্বিতীয়ার্থে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং অক্টোবর শেষ হওয়ার আগেই চলতি বছরের মৃত্যুসংখ্যা গত বছরের ৪১৩ জনের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নেওয়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে বংশবিস্তার করে, যেমন—ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, পানির ট্যাংক বা নির্মাণাধীন ভবন। এসব স্থান নিয়মিত পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের মশক নিধন কার্যক্রম নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত না হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কেবল ওষুধ ছিটিয়ে বা লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; বরং প্রজননস্থল চিহ্নিত করে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করতে হবে এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসাসামগ্রী ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। নাগরিকদেরও নিজেদের বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কোনো একক সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়; এর জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মশার প্রজনন পর্যবেক্ষণে নিয়মিত গবেষণা এবং তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে আগাম প্রস্তুতি ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
২০২৫ সালে দেশে ডেঙ্গুতে ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল।