ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর কাছ থেকে উপকূলের সর্বশেষ কয়েকটি শহর দখলের পর হুথিরা এখন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছের দ্বীপগুলোর ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
এই অগ্রযাত্রার ফলে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যানুযায়ী, শুক্রবার ভোরে হুথি যোদ্ধারা উপকূলের অবশিষ্ট শহরগুলোর দখল নেয়। এর আগে বৃহস্পতিবার ভোরে তারা মোচা নামে পরিচিত আল-মাখা শহরে পৌঁছায়। আল জাজিরার প্রতিবেদক মাহা আলী তায়েজ শহর থেকে জানিয়েছেন, আল-মাখায় পৌঁছানোর পর হুথি যোদ্ধারা সমুদ্রপথে এগিয়ে আশপাশের কয়েকটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
এছাড়া ইয়েমেন সরকারের সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, হুথি যোদ্ধারা বাব আল-মান্দাবের উপকূলীয় শহর ধুবাবেও পৌঁছেছে।
ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য বাব আল-মান্দাব প্রণালিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে। হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবেও এই সমুদ্রপথটির গুরুত্ব অপরিসীম। সরকারি বাহিনী সরে যাওয়ার পর হুথি যোদ্ধারা মায়ুন দ্বীপে পৌঁছেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পেরিম নামেও পরিচিত এই দ্বীপটি বাব আল-মান্দাব প্রণালির মাঝামাঝি কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে।
একটি সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, হুথিরা বাব আল-মান্দাব এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিয়ে নিয়েছে। এছাড়া সানা-ভিত্তিক ইয়েমেন প্রেস এজেন্সি জানিয়েছে, প্রণালির ওপর নজরদারির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আল-ওমারি সামরিক ঘাঁটিও হুথিরা দখল করেছে।
তবে সানা থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক নাবিল আল-ইউসফি জানিয়েছেন, বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে হুথি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে চলে গেলে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ওপর তাদের প্রভাব আরও বাড়বে।
এর আগে লোহিত সাগরে জাহাজ লক্ষ্য করে হুথিদের হামলার কারণে এই নৌপথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। আল জাজিরার প্রতিবেদক ইউসুফ মাওরি জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে হুথিরা কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
এই অগ্রযাত্রার খবরের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৬ ডলারের ওপরে উঠেছে এবং শুক্রবার তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে বন্ধ হওয়ার পথে ছিল। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে বড় ধরনের পাল্টা অভিযান প্রস্তুত করছে—এমন লক্ষণ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্রতিবেদক মাওরি।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের অবরোধ বন্ধ করার এবং আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।
ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণকারী হুথিরা চলতি বছরের শুরুতে আবারও লোহিত সাগরে জাহাজ এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে। তাদের দাবি, ইরানের মিত্রদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন, যিনি আঞ্চলিক মধ্যস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এরপর আরাঘচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গেও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
পাশাপাশি ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে ওমান উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে একটি বৈঠকের আয়োজন করছে।
ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা তাই শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ সংঘাতের নতুন অধ্যায় নয়; লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব ও হরমুজ—মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ তিন নৌপথের নিরাপত্তার সঙ্গেও এটি সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে।