পাবলিক পরীক্ষায় ৫৬ হাজার ২৫১টি খাতার ফল পরিবর্তন কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি আমাদের দেশের শিক্ষা কাঠামোর ভেতর জমে থাকা গভীর সংকটের একটি স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। সারা দেশে ৪ লাখ ২ হাজার ৫২ জন শিক্ষার্থী পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করার পর ১০ লাখ ৫৬ হাজার খাতা নতুন করে দেখা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ২৭ হাজার ৮৩৬ জন শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তিত হয়েছে এবং হাজার হাজার খাতার নম্বর সংশোধন করা হয়েছে। পরীক্ষার ইতিহাসে এত বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীর জিপিএ-৫ প্রাপ্তি, ফেল থেকে পাস এবং গ্রেড পরিবর্তনের ঘটনা বিরল।
ফল প্রকাশের পর টানা এক মাস ধরে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা যে মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে পার করেছেন, তার দায়ভার কে নেবে? আমাদের ঢিলেঢালা এবং দ্রুত ফল প্রকাশের তাড়াহুড়ো মূল্যায়ন পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের জন্য চরম মানসিক নিপীড়নের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত সরকারের সময় যেমন দ্রুত ফল প্রকাশের উল্লাস ছিল, বর্তমান সরকারও সেই একই ভুল পথে হাঁটছে। গুণগত মান নিশ্চিত না করে নির্ধারিত সময়ের আগে ফল প্রকাশ কোনো অর্জন হতে পারে না। প্রযুক্তিনির্ভর বা মেশিননির্ভর হয়ে পড়ার ফলে কাজের মানবিক সচেতনতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে, যার করুণ পরিণতি আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি।
দেশের মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক এখন বোর্ডের খাতা দেখতে অনাগ্রহী, কারণ তারা কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে বেশি ব্যস্ত। বোর্ডের খাতা দেখা একটি দায়িত্বশীল কাজ হলেও অনেকে একে কেবল সামান্য আয়ের উৎস মনে করেন। এর ফলে অনভিজ্ঞ ও নতুন শিক্ষকদের হাতে খাতা তুলে দিতে বোর্ডগুলো বাধ্য হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে খাতা মূল্যায়নের যোগ্যতাসম্পন্ন নয় এমন শিক্ষকও খাতা পেয়ে যান এবং অনেক সময় তারা খাতা নিজে না দেখে স্ত্রী, সন্তান বা শিক্ষার্থীদের দিয়ে মূল্যায়ন করান।
কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজে থাকাকালীন অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলা যায়, তখনো বোর্ডের খাতা দেখার জন্য যোগ্য শিক্ষকের সংকট ছিল। অসাধু শিক্ষকরা প্রায়ই বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে বারবার খাতা হাতিয়ে নিতেন এবং ফেল করানোর পরিবর্তে নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নামতেন। এই অসাধু চর্চা ও গাফিলতি মূল্যায়নের বিশ্বস্ততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
শিক্ষা বোর্ডের প্রশাসনিক পদগুলোতেও নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। প্রশাসনিক ক্ষমতার জোরে অখ্যাত প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা অযোগ্য ব্যক্তিরা বোর্ডের চেয়ারম্যান বা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হচ্ছেন। তাদের নেই কোনো শিক্ষাবিষয়ক উদ্ভাবনী চিন্তা বা নৈতিক সাহস। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক লবিং করে তারা এসব পদ দখল করেন, ফলে শিক্ষা প্রশাসনে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয় না।
এই সংকটের সমাধানে যোগ্য অল্পসংখ্যক শিক্ষকের হাতে খাতা দেওয়া এবং তাদের পারিশ্রমিক উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো প্রয়োজন। এছাড়া প্রথম পরীক্ষকের দেখা খাতা অবশ্যই দ্বিতীয় পরীক্ষক দিয়ে পুনর্নিরীক্ষণ করার ব্যবস্থা করা জরুরি। কেবল শিক্ষকের দক্ষতা বৃদ্ধি, মূল্যায়নে স্বচ্ছতা এবং কম্পিউটার সেকশনের দুর্নীতি রোধের মাধ্যমেই এই সংকট নিরসন করা সম্ভব। অন্যথায়, প্রতি বছর ফল পুনর্মূল্যায়নের নামে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে এভাবেই ছিনিমিনি খেলা চলতে থাকবে।