১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (2026) তারিখে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের তৈরি পোশাক খাতের বড় অংশ এখনো কটননির্ভর রয়ে গেছে, যার সিংহভাগ কাঁচামালই আমদানি করতে হয়। প্রতিযোগী দেশগুলোসহ বিশ্ব যখন নন-কটন বা কৃত্রিম তন্তুর দিকে ঝুঁকছে, তখন বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর কটনের গণ্ডিতেই আটকে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই অতিরিক্ত কটননির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে যেমন রপ্তানি বাজার সংকুচিত করছে, তেমনি শিল্পের মূল্য সংযোজনকেও বাধাগ্রস্ত করছে। এ কারণে পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কটনের বিকল্প উৎসে মনোযোগী হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে তারা নন-কটনে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্থানীয় চাষিরা বার্ষিক চাহিদার মাত্র ২ শতাংশের কম তুলা সরবরাহ করতে পারেন। বাকি ৯৮ শতাংশ তুলাই আমদানি করতে হয় উজবেকিস্তান, ভারত, ব্রাজিল, বেনিন ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব বলছে, এই তুলা আমদানিতে বছরে ব্যয় হয় প্রায় ৫০০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কটন আমদানিকারক দেশে পরিণত করেছে। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৮৫ লাখ বেল তুলার চাহিদা থাকলেও স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয় কমবেশি মাত্র ২ লাখ বেল।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের (আইটিসি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৭২.৭ শতাংশই কটননির্ভর, যা বৈশ্বিক গড় ৪১.৬ শতাংশের প্রায় দ্বিগুণ। তালিকায় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি কটননির্ভর দেশ কেবল পাকিস্তান (৮৫.১ শতাংশ) ও ভারত (৭৪ শতাংশ)। এর বিপরীতে ভিয়েতনামের কটনভিত্তিক রপ্তানি ৩৪.৮ শতাংশ, চীনের ২৯.৪ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ৪১.৯ শতাংশ। আইটিসির তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে প্রতিযোগী দেশগুলো ম্যান-মেইড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তুর দিকে দ্রুত এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশের গতি বেশ ধীর। ২০১৬ সালে দেশের তৈরি পোশাকে ম্যান-মেড ফাইবারের অংশ ছিল ১১.৩ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে প্রায় ১৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে নিটওয়্যারের তুলনায় ওভেনে কটননির্ভরতা তুলনামূলক বেশি।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক ইমরান কাদের তূর্য জানান, বিশ্বব্যাপী কটনের চাহিদা এখন মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফাস্ট ফ্যাশনের জনপ্রিয়তার কারণে বর্তমানে ৭০ শতাংশ চাহিদাই ম্যান-মেড ফাইবারের দিকে চলে গেছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের মূল দুর্বলতা হলো দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বস্ত্রশিল্প সম্পূর্ণ কটনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তবে ফাইবার থেকে ফেব্রিক ডেভেলপমেন্টের কাজ যত দ্রুত করা যাবে, দেশের জন্য তা ততই ইতিবাচক হবে।
পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের মতে, কটন দিয়ে তৈরি পোশাকের বাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং এ থেকে উৎপাদিত পণ্যের দামও তুলনামূলক কম। অন্যদিকে, নন-কটন ও সিন্থেটিক পোশাকের মূল্য বা প্রফিট মার্জিন অনেক বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ বেশি মুনাফা অর্জনের সুযোগ হারাচ্ছে। এছাড়া এলডিসি পরবর্তী সময়ে শুল্ক সুবিধা উঠে গেলে তুলা আমদানির অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ দেশের পোশাক খাতের প্রতিযোগী সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। তবে কিছু ব্যবসায়ী মনে করেন, কটনভিত্তিক পণ্যে দেশের দীর্ঘদিনের শক্তিশালী অবস্থান হঠাৎ করে হারিয়ে যাবে না, বরং পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে কটন ও নন-কটন উভয় খাতেই সক্ষমতা বাড়ানো সময়ের দাবি। এর জন্য পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউউদ্দিন রুবেল বলেন, পরিকল্পনা, অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, জ্বালানি নিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ—এই চার বিষয় একসঙ্গে এগোতে না পারলে ম্যান-মেড ফাইবারে উত্তরণের যাত্রা ধীরগতিরই থেকে যাবে এবং বিশ্ববাজারের সঙ্গে ব্যবধান বাড়তে থাকবে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানি সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, ম্যান-মেড ফাইবার পণ্যে ভালো করতে হলে নিজস্ব কাঁচামাল হিসেবে ‘ফিলামেন্ট ইয়ার্ন’ প্রয়োজন। কিন্তু দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি সুবিধা না থাকায় আপাতত চীন ও ভারত থেকে এটি আমদানি করতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই খাতে উত্তরণ ছাড়া বিকল্প নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।