প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠা, নিজের পায়ে হাঁটা, পানি পান করা কিংবা খাবারের স্বাদ অনুভব করা—এগুলো কি সাধারণ বিষয়? অথচ আমরা যখন মাস শেষে হাতে টাকা কম দেখি বা ব্যবসায় লস হয়, তখন সহজেই বলে ফেলি, আমার রিযিকটাই বোধহয় কম। আমরা সাধারণত অন্যের নতুন গাড়ি, বাড়ি বা বেশি আয়ের সাথে নিজের জীবনের তুলনা করি। কিন্তু এই হিসাব করার পদ্ধতিই আমাদের ভুল। আমরা টাকা গুনি, কিন্তু সুস্থতার দিনগুলো গুনি না। বেতন হিসাব করি, কিন্তু অবসর সময়ের মূল্য বুঝি না। এমনকি ঘরের শান্তি, ভালো মানুষ, ঈমান এবং ইলম শেখার সুযোগকেও হিসাবের খাতায় রাখি না।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নাহলের ১৮ নম্বর আয়াতে বলেছেন, যদি তোমরা আল্লাহর নিয়ামত গণনা করো, তবে তা গুণে শেষ করতে পারবে না। আল্লাহ এখানে বলেননি যে নিয়ামত খুঁজে বের করতে কষ্ট করতে হবে, বরং তিনি বলেছেন তা গণনা করে শেষ করা অসম্ভব। আমরা জীবনের একটি অপূর্ণতাকে সামনে রেখে বাকি শত শত নিয়ামতের ওপর কালো পর্দা টেনে দিই। বিয়ে হয়নি, সন্তান হয়নি বা পছন্দের চাকরি হয়নি—এই অজুহাতে আমরা বর্তমানের নিরাপত্তা ও অন্যান্য দানগুলোর শুকরিয়া আদায় করতে ভুলে যাই।
অবশ্যই হালাল সম্পদ আল্লাহর বড় নিয়ামত এবং অভাব হলে তা দূর করার জন্য চেষ্টা, দোয়া ও পরিকল্পনা করা ইসলামের শিক্ষা। কিন্তু ভুলটা হয় তখনই, যখন টাকাকেই রিযিকের একমাত্র মাপকাঠি বানিয়ে ফেলা হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ সহিহ আল-বুখারির ৬৪১২ নম্বর হাদিসে বলেছেন, দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত—সুস্থতা ও অবসর সময়। একজন কোটিপতি ব্যক্তিও হয়তো রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারেন না, কিন্তু সীমিত আয়ের মানুষও মা-সন্তানের দোয়া ও ভালোবাসায় প্রশান্তি পেতে পারেন। অন্যের জীবনের কেবল একটি ডাল দেখে নিজের পুরো গাছের সাথে তুলনা করা মানেই কৃতজ্ঞতা বা শুকরিয়াকে নষ্ট করা।
আজ সময় হয়েছে নিজের জীবনটাকে নতুনভাবে দেখার। আপনার কাছে সময় আছে, শরীর এখনও কাজ করতে পারে, কেউ আপনাকে ভালোবাসে, আপনি হালাল খাবার পাচ্ছেন এবং দ্বীনের কথা শেখার সুযোগ পাচ্ছেন—এগুলো সবই বিশাল নিয়ামত। গুনাহের পর অন্তরে অপরাধবোধ হওয়াও বড় প্রাপ্তি, কারণ এমনও অন্তর আছে যেখানে গুনাহের পর কোনো অনুশোচনাই জাগে না। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মানুষ বুঝতে পারে হাঁটতে পারাটা কত বড় সম্পদ ছিল। তাই শুধু রিযিক বৃদ্ধির দোয়া নয়, বরং আল্লাহ যা দিয়েছেন তা চেনার তাওফিক এবং তার শুকরিয়া আদায় করার সামর্থ্য প্রার্থনা করা উচিত।
জীবনকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে আজই নিজের জীবনের ৫টি নিয়ামত লিখে ফেলুন। এগুলো হতে পারে শরীরের কোনো সুস্থতা, আপনার জন্য আশীর্বাদস্বরূপ কোনো মানুষ, দ্বীন শেখার কোনো সুযোগ, বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার অভিজ্ঞতা কিংবা এতদিন স্বাভাবিক ভেবে আসা ছোট কোনো প্রাপ্তি। এগুলোর তালিকা করে মনেপ্রাণে বলুন—আলহামদুলিল্লাহ।