বাংলাদেশ বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও জাতীয় অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান এখনো বেশ সীমিত। বর্তমান জিডিপিতে এই খাতের অবদান মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ, যা ৬ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। এই লক্ষ্য অর্জনে একটি পর্যটন মাস্টারপ্ল্যান হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, যা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব ফাহমিদা আখতার জানিয়েছেন, পর্যটন খাতের প্রকৃত চিত্র এবং কর্মসংস্থান ও পর্যটক আগমনের সঠিক তথ্য পেতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাধ্যমে ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট তৈরির কাজ চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় না থাকলেও, পরিকল্পিতভাবে তা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। কক্সবাজার, সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো দর্শনীয় স্থানগুলোতে ভালো যোগাযোগব্যবস্থা, মানসম্মত হোটেল-মোটেল এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব পর্যটন বিকাশে বড় বাধা। প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন (পাটা) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব তৌফিক রহমান উল্লেখ করেন, বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে হলে বিভিন্ন দেশের ট্রাভেল অ্যাডভাইজরিতে বাংলাদেশকে 'রেড মার্ক' বা উচ্চ সতর্কতাপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি পরিবর্তনের জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
পর্যটন খাতে বিনিয়োগকারী বেসরকারি উদ্যোক্তারাও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নাগরিক সুবিধার অভাবের কথা তুলে ধরেছেন। ওয়েসিস কনসোর্টিয়ামের প্রধান নির্বাহী জুয়েল খান মনে করেন, অবকাঠামো থাকলেও আন্তর্জাতিক মানের সার্ভিস কালচার ও ব্র্যান্ডিংয়ের অভাবে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত বিদেশি পর্যটক পাচ্ছে না। এই সংকট উত্তরণে ইকো-ট্যুরিজম, কালচারাল ট্যুরিজম ও অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমকে কেন্দ্র করে আলাদা ব্র্যান্ডিংয়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটনসেবার সঙ্গে যুক্ত করলে তা স্থানীয় অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬ উপলক্ষে সরকার সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচির আয়োজন করেছে এবং প্রথমবারের মতো ১৩টি ক্যাটাগরিতে 'বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার ২০২৬' প্রদান করা হবে। এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো 'ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন'। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও বাংলাদেশের জন্য এটি এখনো নতুন ক্ষেত্র। তবে দিনশেষে মাস্টারপ্ল্যান তৈরি বা নীতিমালার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর সঠিক বাস্তবায়ন। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণার ঘাটতি দূর করতে না পারলে অবারিত সম্ভাবনার এই শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে না।