বিশ্ব হৃদরোগ দিবস উপলক্ষে হৃদরোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ ও উন্নত চিকিৎসার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্রতিবছর ২৯ সেপ্টেম্বর পালিত এই দিবসে বিশ্ব হার্ট ফেডারেশন এবারের প্রচারণায় ‘হার্ট ডিজিজ ক্যান হাইড ইন প্লেইন সাইট : ডোন্ট মিস এ বিট’ বার্তাটি সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হৃদরোগের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এবং প্রতি বছর যত মানুষ মারা যান, তাদের প্রায় প্রতি তিনজনের একজনের মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ।
গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা এবং গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে জানানো হয়েছে, উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি হৃদরোগের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ হৃদরোগে অকাল মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার ৫২ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চরক্তচাপ। এছাড়া ‘বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে-২০১৮’ অনুযায়ী, দেশের ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সি জনগোষ্ঠীর প্রায় ১২ শতাংশ উচ্চরক্তচাপে আক্রান্ত, যা ভবিষ্যতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
দেশে উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি) কর্নার চালু করা হলেও সেখানে ওষুধ সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় এনসিডি কর্নারে মজুত ওষুধ এক থেকে দুই মাসের বেশি চলার মতো নয়। কোথাও কোথাও রোগীদের এক মাসের পরিবর্তে মাত্র ১০ দিনের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে, যা নিয়মিত ওষুধনির্ভর দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত করছে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ডা. শামিম যোবায়ের জানান, হাসপাতালগুলোর এমএসআর ফান্ডের পরিমাণ খুবই কম হওয়ায় এনসিডি কর্নারের জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
চিকিৎসাসেবার বড় অংশ এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী বলেন, দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার আইসিইউ বেড থাকলেও তার বেশির ভাগই রাজধানী ও বড় শহরকেন্দ্রিক। হৃদরোগের চিকিৎসা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে বিভাগীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তবে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী মনে করেন, চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ৫ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। এই বর্ধিত বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চরক্তচাপের ওষুধে ব্যয় করলে ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদরোগের চিকিৎসায় হাসপাতাল ও আইসিইউ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিরোধে জোর দেওয়া জরুরি। ধূমপান বর্জন, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করার মাধ্যমে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে তারা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।