কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় ১৩ বছরের শিক্ষার্থী অপ্রতিম হত্যার শিকার হওয়ার পর এ ধরনের অপরাধীদের লাগাম টানতে নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ সদর দপ্তর। শুধু অভিযান, আটক কিংবা গ্রেপ্তার করেই নয়, দেশজুড়ে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তার বহুমুখী উপায় খুঁজছে পুলিশ। এ লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তৈরি করতে পুলিশের একজন ডিআইজিকে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনাকে সামনে রেখে গত রবিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের ক্রাইম জোন ও গোয়েন্দা পুলিশের ডিসিদের নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে একটি বিশেষ সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের বিদ্যমান তালিকা হালনাগাদ করার কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং শিগগিরই দেশজুড়ে ‘অলআউট’ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বর্তমানে কুমিল্লাসহ পাঁচটি জেলায় বিশেষ অভিযান চলছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ছিনতাই, চুরি কিংবা মারামারির মতো অপরাধ দিয়ে শুরু হলেও কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের ধরন দিন দিন আরও গুরুতর হয়ে উঠছে। বিভিন্ন অভিযানে তাদের কাছ থেকে দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, অপহরণ, ডাকাতি, জমি দখল ও ভাড়াটে হিসেবে হামলার মতো অপরাধেও তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ বাড়ছে। কুমিল্লায় অপ্রতিম নিহত হওয়ার ঘটনার পর জেলা পুলিশ প্রথম কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান জোরদার করে। সেখানে প্রথম দিন ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। পরে ৪৫১ জনকে মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয় এবং ১৭৩ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দ্বিতীয় দফায় ২৫৪ জন এবং গত রবিবার রাতে তৃতীয় দফায় ৪১৫ জনকে আটক করা হয়। সব মিলিয়ে কুমিল্লায় তিন দফায় মোট আটকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,২৯৩ জনে।
কুমিল্লার পাশাপাশি গত রবিবার চাঁদপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও চট্টগ্রামেও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে পুলিশ। চাঁদপুরে কিশোর অপরাধ ঠেকাতে আটটি উপজেলায় অভিযান চালিয়ে ৩৭০ জনকে আটক করা হয়, যাদের মধ্যে ৩৫৫ জনকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আটকদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে মাদক ও অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে। লক্ষ্মীপুরের ছয়টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ২৬৬ জনকে আটক করা হয়, যাদের মধ্যে ২১৪ জনকে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ফেনী শহরে অভিযান চালিয়ে ৩৮ কিশোরকে আটক করা হয়। এছাড়া চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ একযোগে ১৭টি থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪৪৫ জনকে আটক করেছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ বা পুলিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে কিশোর গ্যাং পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ জেলা ও মহানগর পুলিশের কাছে কিশোরদের হালনাগাদ তালিকা নেই, যার ফলে নতুন করে কারা অপরাধে জড়াচ্ছে তা জানার ক্ষেত্রে তথ্যের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। তবে ঢাকা মহানগরীতে ১৫৮টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে, যাদের মোট সদস্য সংখ্যা ১,২১৯ জন। ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন জানান, ঢাকা মহানগর পুলিশ বিভিন্ন পর্যায়ে আইন প্রয়োগ করছে। যাদের অপরাধের রেকর্ড নেই, তাদের মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, আবার অনেককে নিয়মিত মামলায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এমনকি ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে সামারি ট্রায়ালে সাজাও দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তালিকা হালনাগাদের কাজও চলছে।
পুলিশ ও মামলার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ রয়েছে ছিনতাইয়ের। এছাড়া দোকানপাট, ফুটপাত, গ্যারেজ বা স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদাবাজি এবং এলাকা নিয়ন্ত্রণে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন জুয়াও কিশোরদের অপরাধে জড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো হত্যা। গ্যাং-সংঘর্ষ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডে কিশোরদের নাম আসছে। কুমিল্লায় ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। মাদক সেবন, মাদক বহন ও বিক্রির পাশাপাশি জমি ও স্থাপনা দখল এবং প্রভাবশালী মহলের হয়ে ভাড়াটে হিসেবে কাজ করার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এছাড়া নারী ও কিশোরীদের উত্ত্যক্ত করা এবং যৌন হয়রানির ঘটনাও ঘটছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে প্রকৃত অপরাধের সঠিক ধারায় মামলা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কিশোরদের পাশাপাশি এই গ্যাংয়ের পেছনে থাকা ‘বড় ভাই’, পৃষ্ঠপোষক, অর্থদাতা এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রান্তিক পরিবারের পড়াশোনা ও কর্মের বাইরে থাকা কিশোরদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, পুলিশি ব্যবস্থার বাইরে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং সামাজিকভাবেও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমানে ঢাকায় কিশোর গ্যাংয়ের ১৫৮টি গ্রুপ রয়েছে, যার মোট সদস্য সংখ্যা ১২১৯।