রাজধানীর ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর এবং মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় এ পর্যন্ত যথাক্রমে ৬ ও ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে দুটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার কোনোটিতেই হামলার নেপথ্যে থাকা মূল পরিকল্পনাকারী বা নির্দেশদাতাদের এখনো আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ।
গত শনিবার দিবাগত রাতে ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজের কার্যালয় ও আশপাশের স্থাপনায় ব্যাপক হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওটি। এ ঘটনায় নিউগিনি প্রপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এই হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। হামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নাম সামনে এসেছে। মামলার ৪ নম্বর আসামি গোলাম মহিউদ্দিনের নিউগিনি প্রপার্টিজের পাশে ৩৫ শতাংশ জমি রয়েছে। চারপাশের সব জমি নিউগিনি প্রপার্টিজের হওয়ায় ওই জমিতে যাতায়াতের জন্য তাঁদের রাস্তা ও ফটক ব্যবহার করতে হয়। এই পথ ব্যবহার নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে হামলা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। তাঁর বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
এ মামলায় এখন পর্যন্ত পুলিশ ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) যৌথভাবে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে। ডিবি প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ডিবি তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে, যার মধ্যে শাহ আলম অনিক রয়েছেন, যিনি মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। গ্রেপ্তার অন্য আসামিরা হলেন মামুন, আসলাম, মুন্না, মিজানুর রহমান ও শাহরিয়ার মাহমুদ। এদের মধ্যে মিজানুর মামলার ৯ নম্বর আসামি। ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন জানান, গ্রেপ্তার হওয়া মামুন ও মুন্না সরাসরি অস্ত্র নিয়ে হামলায় অংশ নিয়েছিলেন। মামুনের বাড়ি গফরগাঁওয়ে এবং মুন্না ভাষানটেক বস্তিতে থাকেন। অপর আসামি আসলাম টাঙ্গাইলের বাসিন্দা এবং পেশায় অটোরিকশা চালক। ঘটনার সাথে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে, মিরপুরের শাহ আলী থানা এলাকার রাড্ডা এমসিএইচ স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় এ পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে এক্সক্যাভেটর দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেয় হামলাকারীরা। স্থানীয় সূত্র জানায়, হামলার আগে বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন এবং মামলার এজাহারভুক্ত আসামি বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার কার্যালয়ের সামনে বিপুলসংখ্যক লোক জড়ো হয়। সিসিটিভি ফুটেজেও এই জমায়েত এবং একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাসের সন্দেহজনক চলাচল দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, হামলা ও ভাঙচুরের সময় হানিফ মিয়া, আবুল কালাম এবং ঢাকা মহানগর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেলসহ কয়েকজন ওই মাইক্রোবাসে করে ঘটনাস্থল ঘুরে দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন। মামলায় হানিফ মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
রাড্ডা ক্লিনিকে হামলার পর দখল নেওয়া সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির কার্যক্রমের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে। তাঁরা এলাকার সাবেক সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হলেও ফেরদৌসী আহমেদ এই হামলায় নিজের জড়িত থাকার দাবি অস্বীকার করেছেন। পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। সর্বশেষ গত রোববার রাতে ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত থাকার অভিযোগে মো. মিন্টু (৩৫) ও মো. মিলন (৪০) নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁদের কাছ থেকে লুট করা মালামাল উদ্ধার করা হয়। এর আগে শুক্রবার রাতে মো. সোহেল (২২), মো. জুয়েল (২৩), জিহাদ হাসান (২১) ও মো. রাব্বি (২০) নামের চার তরুণকে গ্রেপ্তার করে শাহ আলী থানা পুলিশ। পুলিশ জানায়, টাকার বিনিময়ে এই ভাসমান তরুণেরা ভাঙচুরে অংশ নিয়েছিল। এছাড়া শনিবার সন্ধ্যায় গ্রেপ্তার হন সমমনা দোকানদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম (৫৩) সহ আরও ছয়জন। বাকিরা হলেন মো. শাহাদাত হোসেন (৩৩), কাজী মকবুল হোসেন (৫৮), মো. আতিকুর রহমান (৩৩), মো. কামরুল ইসলাম (৫২) ও মো. শাকিল (২০)। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে এক্সক্যাভেটর কারা এনেছিল এবং কারা নেতৃত্বে ছিল তা শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
সাম্প্রতিক এই হামলা, ভাঙচুর ও দখলের ঘটনাকে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির লক্ষণ হিসেবে দেখছেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান। তিনি বলেন, মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিক ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার সঙ্গে প্রভাবশালী বা শক্তিশালী মহলের সম্পৃক্ততার গুঞ্জন থাকায় পুলিশ শুরুতে নীরব ভূমিকা পালন করেছে। মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও আদাবরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখে মনে হচ্ছে দেশ মব সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। সরকার এখনো এমন কোনো শক্ত বার্তা দিতে পারেনি, যাতে এই সন্ত্রাসীরা ভয় পায়।