জাপানের নাগোয়া সিটি মিজুহো পার্ক অ্যাথলেটিক স্টেডিয়ামে জমকালো কিন্তু সংক্ষিপ্ত এক আয়োজনের মধ্য দিয়ে পর্দা নামল ২০তম এশিয়ান গেমসের। গত ১৯ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এশিয়ার সবচেয়ে বড় এই ক্রীড়া আসরের সমাপ্তি ঘটল ৪ অক্টোবর রাতে। সমাপনী অনুষ্ঠানের মঞ্চে জাপানের পতাকার পাশে ওড়ানো হয় কাতারের পতাকা, কারণ চার বছর পর এই গেমসের মশাল জ্বলবে দোহার মাটিতে। তবে এবারের আসরটি ক্রীড়াপ্রেমীদের মনে থাকবে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য, তরুণদের উত্থান, বাংলাদেশের একটি মাত্র ব্রোঞ্জ এবং আয়োজকদের নানা সাংগঠনিক বিতর্কের কারণে।
এবারের গেমসের পদক তালিকার দিকে তাকালে এটিকে এশিয়ান গেমসের চেয়ে ‘চায়না গেমস’ বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত মনে হতে পারে। চার দশক ধরে এশিয়ার ক্রীড়াঙ্গন শাসন করা চীন এবারও বাকিদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে ছিল। আসর শেষে চীনের ঝুলিতে জমা পড়েছে রেকর্ড ১৬৯টি স্বর্ণ, ৮৯টি রুপা এবং ৮৩টি ব্রোঞ্জসহ মোট ৩৪১টি পদক। বিপরীতে দ্বিতীয় স্থানে থাকা স্বাগতিক জাপানের স্বর্ণের সংখ্যা ছিল মাত্র ৮৩টি। জাপানি অ্যাথলেটরা ৯৫টি রুপা ও ৯১টি ব্রোঞ্জসহ মোট ২৬৯টি পদক পেয়ে রানার্স-আপ হিসেবে সন্তুষ্ট থাকে। চীনের এই আধিপত্য প্রমাণ করে যে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রতিভা অন্বেষণে তারা কতটা এগিয়ে।
এবারের আসরে প্রায় ১১ হাজার অ্যাথলেট অংশ নেন, যা গত প্যারিস অলিম্পিকের চেয়েও বেশি। তবে এত বড় আসরেও পদক বণ্টনের বৈষম্য ছিল চোখে পড়ার মতো। পদক তালিকার তলানিতে থাকা বাংলাদেশের ঝুলিতে জুটেছে মাত্র একটি ব্রোঞ্জ পদক। উশুতে জিন্নাত আক্তারের জেতা সেই ব্রোঞ্জটিই ছিল বাংলাদেশের একমাত্র অর্জন, যার ফলে বাংলাদেশ ৩৭তম অবস্থানে থেকে আসর শেষ করেছে। বাংলাদেশের মতোই মাত্র একটি করে ব্রোঞ্জ পেয়েছে ব্রুনেই, লাওস ও সিরিয়া। অন্যদিকে মঙ্গোলিয়া ১টি স্বর্ণ, ১টি রুপা ও ১৩টি ব্রোঞ্জ নিয়ে মোট ১৫টি পদক জিতেছে।
পুলে চীনের সাঁতারুদের আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো। ছয় দিনের সাঁতার প্রতিযোগিতায় চীন একাই ৩০টি স্বর্ণ জয় করে। এর মধ্যে চীনের ঝাং ঝানশুও একাই জিতেছেন সাতটি স্বর্ণপদক। ফ্রিস্টাইলের ২০০, ৪০০, ৮০০ ও ১৫০০ মিটার ব্যক্তিগত ইভেন্টের পাশাপাশি তিনটি রিলেতেও সোনা জিতেছেন এই তারকা। এছাড়া চীনের মাত্র ১৩ বছর বয়সি বিস্ময় বালিকা ইউ জিদি ২০০ মিটার বাটারফ্লাই এবং ২০০ ও ৪০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলেতে স্বর্ণ জিতে বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছেন। তবে চীনের এই দাপটের মাঝেও সাঁতারে একমাত্র বিশ্বরেকর্ডটি গড়েছে জাপান। ২০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে জাপানের শিন ওহাশি ২ মিনিট ৪.৮৩ সেকেন্ড সময় নিয়ে নতুন রেকর্ড গড়েন।
মাঠের লড়াই ছাপিয়ে আয়োজক কমিটির নানা অব্যবস্থাপনা ও বিতর্কও এবার বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। খরচ কমাতে এবার আলাদা অ্যাথলেটস ভিলেজ তৈরি না করে ক্রুজ জাহাজ, হোটেল এবং অস্থায়ী কাঠের ঘরে আবাসন ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেখানে ছোট বিছানা, ছাদ চুইয়ে পানি পড়া এবং ভুল করে একই কক্ষে নারী ও পুরুষ অ্যাথলেটকে বরাদ্দ দেওয়ার মতো বিব্রতকর ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া নাগোয়া শহর থেকে দূরবর্তী ভেন্যুগুলোর পরিবহন সংকট এবং দর্শক খরা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়। এসব ভুলের জন্য আয়োজক কমিটির মহাসচিব সাতোশি মুরাতে প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চেয়েছেন।
এবারের আসরে অংশ নিয়েছেন অন্তত ১১ হাজার ক্রীড়াবিদ। সংখ্যাটি দুবছর আগে অনুষ্ঠিত প্যারিস অলিম্পিকে অংশ নেওয়া প্রায় ১০ হাজার ৭০০ অ্যাথলেটের চেয়েও বেশি। কিন্তু এত বড় আসরের মধ্যেও পদকবণ্টনে বৈষম্যটা স্পষ্ট। একদিকে চীনের মতো দেশগুলো স্বর্ণের পর স্বর্ণ জিতেছে; অন্যদিকে কয়েকটি দেশকে একটি পদকের জন্যও অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘদিন।