২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার জয় করেছেন বেলজিয়ামের প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজ্যান। দক্ষিণ মেরুর বরফে স্থাপিত ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’র মাধ্যমে মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করার ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য তাকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সুইডেনের স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বছরের নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে।
ফ্রান্সিস হালজ্যানই প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন যে, দক্ষিণ মেরুর স্বচ্ছ বরফ ব্যবহার করে নিউট্রিনোর মতো অতি দুর্লভ কণা শনাক্ত করা সম্ভব। তার বৈজ্ঞানিক দূরদর্শিতা এবং নেতৃত্বের ফলেই ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’ গড়ে ওঠে। প্রায় এক ঘনকিলোমিটার বরফজুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল গবেষণা অবকাঠামোতে অসংখ্য আলোকসংবেদী সেন্সর বসানো হয়েছে।
নিউট্রিনো হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও প্রায় ভরহীন এক কণা, যা প্রতিনিয়ত মহাবিশ্ব থেকে পৃথিবীতে আসছে এবং পৃথিবী ও মানুষের শরীরের মধ্য দিয়ে প্রায় কোনো বাধা ছাড়াই চলে যায়। তবে অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্রে যখন কোনো নিউট্রিনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়, তখন সামান্য আলোর ঝলক তৈরি হয়। বরফের গভীরে স্থাপন করা বিশেষ সেন্সর ব্যবহার করে সেই আলো শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
মহাবিশ্বে এমন কিছু প্রাকৃতিক কণা ত্বরক রয়েছে, যেগুলো পৃথিবীর গবেষণাগারে তৈরি সর্বোচ্চ শক্তির কণার চেয়েও প্রায় ১০ লাখ গুণ শক্তিশালী কণা তৈরি করতে পারে। তবে এসব শক্তিশালী মহাজাগতিক উৎসের প্রকৃতি ও সেখানে সংঘটিত প্রক্রিয়া এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে অনেকটাই রহস্যময়। উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনোর বিশেষত্ব হলো, এগুলো অন্য অনেক কণার মতো মহাজাগতিক পথে সহজে বাধাগ্রস্ত হয় না বা দিক পরিবর্তন করে না। ফলে যে উৎস থেকে নিউট্রিনো তৈরি হয়, সেখানকার তথ্য প্রায় অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে, যা মহাবিশ্বের দূরবর্তী ও শক্তিশালী ঘটনাগুলো জানার নতুন পথ উন্মুক্ত করেছে।
১৯৮৮ সালে ফ্রান্সিস হালজ্যান দক্ষিণ মেরুতে নিউট্রিনো শনাক্তের ধারণাটি প্রথম উপস্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে অন্যান্য গবেষকদের সমর্থনে বরফের গভীরে সেন্সর স্থাপনের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয় এবং ২০১১ সালে আইসকিউব স্থাপনের নির্মাণকাজ শেষ হয়। এই অবজারভেটরি চালুর পর গবেষকেরা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনোর সন্ধান পান এবং পরবর্তীতে সৌরজগতের অনেক দূরের উৎস থেকেও আসা নিউট্রিনো শনাক্ত করতে সক্ষম হন, যা নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন যুগের সূচনা করে।
নোবেল কমিটি ফর ফিজিক্সের চেয়ারম্যান মার্ক পিয়ার্স বলেন, ফ্রান্সিস হালজ্যান আন্তর্জাতিক গবেষক ও প্রকৌশলীদের একটি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে একটি অসাধারণ বৈজ্ঞানিক যন্ত্র তৈরি করেছেন। তার অধ্যবসায় ও বৈজ্ঞানিক দূরদর্শিতা জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন একটি পথ উন্মুক্ত করেছে। আইসকিউব থেকে সংগৃহীত তথ্য মহাজাগতিক পরিবেশ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের নতুন ধারণা দেবে এবং মহাবিশ্বের অজানা বিভিন্ন ঘটনা আবিষ্কারে সহায়তা করবে।
উল্লেখ্য, সোমবার (৫ অক্টোবর) চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও নিউরোলজিস্ট কার্ল ডাইসেরথ এবং জার্মান বিজ্ঞানী পিটার হেগেমান ও জর্জ নাগেল। এছাড়া বুধবার রসায়ন, বৃহস্পতিবার সাহিত্য এবং শুক্রবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। ১২ অক্টোবর অর্থনীতিতে পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ বছরের নোবেল মৌসুম শেষ হবে।