একসময় দেশের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। মানুষের চিঠি, পার্সেল, সঞ্চয়পত্র থেকে শুরু করে সরকারি বার্তা ও আদালতের নোটিশ সবই পৌঁছে যেত ডাকপিয়নের হাত ধরে। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় আজ ধুঁকছে দেশের অধিকাংশ ডাকঘর। চিঠির জায়গা মোবাইল ও ই-মেইল এবং মানি অর্ডারের জায়গা মোবাইল আর্থিক সেবা নিলেও ডাক বিভাগ নিজেকে আধুনিক করতে পারেনি। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ডাকঘরগুলো এখন সেবা দিতে পারছে না, অনেক কার্যালয় থাকছে তালাবদ্ধ।
ডাক বিভাগের এই বেহাল দশা সম্পর্কে মহাপরিচালক (ডিজি) কাজী আসাদুল ইসলাম জানান, তারা জনবল সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন। কোনো অফিস তালাবদ্ধ থাকার সুনির্দিষ্ট তালিকা পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বেশ হতাশাজনক। সম্প্রতি রাজধানীর মাণ্ডা ডাকঘরে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ সময় এটি তালাবদ্ধ থাকে। অভিযোগ রয়েছে, সাব-পোস্টমাস্টার ফাতেমা আক্তার নিয়মিত অফিসে না এসে নিজের বাসায় দাপ্তরিক কাজ সারেন এবং সেখানে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ান। তবে ফাতেমা আক্তার এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সরকার যে মাসিক ভাতা দেয় তা দিয়ে এক মাসের চায়ের খরচও চলে না। অন্যদিকে পোস্টম্যান মো. আব্দুর রহমান জানান, তিনি একাই চিঠি গ্রহণ ও বিলির কাজ করায় চিঠি দিতে বাইরে গেলে অফিস বন্ধ রাখতে হয়।
রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল উপ-ডাকঘরে গিয়েও তালা ঝুলতে দেখা যায়। প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষার পর সাব-পোস্টমাস্টার দীপক চন্দ্র দাস এসে তালা খোলেন। তিনি জানান, মাত্র দুজন কর্মী থাকায় বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনে অফিস বন্ধ রাখতে হয়েছিল। দয়াগঞ্জ পোস্ট অফিসেও সাব-পোস্টমাস্টার আবুল হাসান একাই দায়িত্ব পালন করছেন। গ্রাহক না থাকায় তিনি অলস সময় পার করলেও জানান, চিঠি বিলির চাপ রয়েছে এবং বাইরে গেলে অফিস বন্ধ রাখতে হয়। অপরদিকে মতিঝিলের বিআইডিসি সাব-পোস্ট অফিসের সাব-পোস্টমাস্টার আবুল বাসার জানান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আধিক্যের কারণে তাদের গ্রাহক তুলনামূলক কম। বাসাবো সাব-পোস্ট অফিসের সাব-পোস্টমাস্টার মো. ইমদাদুল হক অবশ্য দাবি করেন, গ্রাহক কম থাকলেও তারা সঞ্চয়পত্র, এফডিআর ও পার্সেল বুকিংয়ের কাজে ব্যস্ত থাকেন। ব্যতিক্রম শুধু খিলগাঁও উপ-ডাকঘরে, যেখানে কাজের বেশ চাপ দেখা গেছে। তবে পার্সেল পাঠাতে আসা আরিফুল ইসলাম নামের এক গ্রাহক জানান, প্রায়ই সেখানে সেবা পেতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
ডাকঘরগুলোর দেওয়ালে নানা সেবার তালিকা ঝুললেও বাস্তবে অধিকাংশ সেবা এখন আর পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন সার্কেলের পোস্টমাস্টার জেনারেল মৌসুমী রহমান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং সরাসরি কথা বলার অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করেন। তবে ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল (ঢাকা উত্তর) মো. আব্দুল হামিদ জানান, অনেক ডাকঘরের ল্যাপটপ ও কম্পিউটার অত্যন্ত পুরোনো এবং বাজেট সংকটের কারণে এগুলো পরিবর্তন করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে জনবল সংকট ও তদারকির অভাবকেও তিনি দায়ী করেন।
ঢাকার বাইরের চিত্র আরও করুণ। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ১৪টি ডাকঘরের অধিকাংশেরই কোনো অস্তিত্ব নেই। ঢাকার ধামরাইয়ের কালামপুর সাব-পোস্ট অফিসটি পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত হলেও আজ পর্যন্ত রাজস্বের আওতায় আসেনি। জরাজীর্ণ ও নোংরা পরিবেশের এই অফিসটি দিনে মাত্র দুই ঘণ্টা খোলা থাকে। এখানকার পোস্টমাস্টার দুলাল হোসেন পান ৫ হাজার ৮৪৩ টাকা, বিলিকারক ৪ হাজার ৩শ টাকা এবং রানার পান ৪ হাজার ১শ টাকা মাসিক সম্মানি। এছাড়া মানিকগঞ্জের সিংগাইরে ১১টি ডাকঘরের কোনো নিজস্ব ভবন নেই, জামালপুরের ইসলামপুরে ডাকঘরগুলোতে উপযুক্ত কর্মপরিবেশ ও চিঠি রাখার বাক্স নেই এবং চাঁদপুরের মতলব উত্তরে জরাজীর্ণ ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। তবে রাঙামাটিতে সাধারণ ডাকসেবা ঝিমিয়ে পড়লেও প্রধান ডাকঘরটি 'স্পিড পোস্ট সেবা' চালুর মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এই ডাকঘরটি নিজস্ব পরিবহণে দ্রুত পণ্য ডেলিভারি দিয়ে বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসের মতো সেবা দিচ্ছে।
ডাকসেবার এমন বেহাল দশা নিয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে যেসব অনিয়ম উঠে এসেছে, সেগুলোর তথ্য পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, ডাকসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার জন্য কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে এসব সমস্যা আর থাকবে না।