দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা সংস্কার ও স্বস্তির বার্তা সত্ত্বেও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই প্রবাহে গতি ফিরছে না। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নিট বিদেশি বিনিয়োগ আগের তিন মাসের তুলনায় ২২.৪৪ শতাংশ কমেছে। এর বিপরীতে একই সময়ে দেশের সার্বিক বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ডলার, যা জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ছিল ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। প্রান্তিকভিত্তিতে কমলেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় নিট প্রবাহ ১২.৭৮ শতাংশ বেড়েছে; কারণ ২০২৩ সালের এপ্রিল-জুনে এফডিআই এসেছিল ৩০ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। সব মিলিয়ে গত জুন শেষে দেশে প্রাক্কলিত মোট বিদেশি বিনিয়োগের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২১.৪২ বিলিয়ন ডলারে।
বিনিয়োগের খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইকুইটি বা নতুন মূলধনী বিনিয়োগ এসেছে ৭ কোটি ৭ ৪ লাখ ডলার। এটি পূর্ববর্তী প্রান্তিকের চেয়ে ১.০৭ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ের ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলারের তুলনায় ৪.৭৭ শতাংশ কম। একই প্রান্তিকে পুনর্বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৬ কোটি ডলারে, যা আগের প্রান্তিকের চেয়ে ২৩.৯২ শতাংশ কম হলেও আগের বছরের একই সময়ের ১৬ কোটি ৮২ লাখ ডলারের তুলনায় ৫৫ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে আন্তঃকোম্পানি ঋণে, যা আগের প্রান্তিকের চেয়ে ৬৭ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৮৫.১৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। উল্লেখ্য, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নতুন পুঁজি, অর্জিত মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ ও আন্তঃকোম্পানি ঋণের সমষ্টি থেকে পুঁজি প্রত্যাহার ও ঋণ পরিশোধ বাদ দিয়ে নিট এফডিআই হিসাব করা হয়।
অন্যদিকে, বিনিয়োগ ঘাটতির বিপরীতে বিদেশি ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, মার্চ শেষে দেশে মোট বিদেশি ঋণ ছিল ১১০.৯৩ বিলিয়ন ডলার, যা জুন শেষে বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪.৯৮ বিলিয়ন ডলার। মাত্র তিন মাসে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৪.০৫ বিলিয়ন ডলার। এই ঋণের সিংহভাগই সরকারি খাতের। জুন শেষে সরকারি খাতের ঋণস্থিতি ৯০.৯১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৯৫.১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, অর্থাৎ তিন মাসে সরকারি ঋণ বেড়েছে ৪.১৯ বিলিয়ন ডলার। বিপরীত চিত্র দেখা গেছে বেসরকারি খাতে; মার্চে ২০ বিলিয়ন ডলার থাকা বিদেশি ঋণ জুন শেষে কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯.৮৭ বিলিয়ন ডলারে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্ববাজারে চড়া সুদহার, টাকার অবমূল্যায়ন ও ডলারের ওপর চাপের কারণে স্বল্পমেয়াদি ঋণ দ্রুত পরিশোধ করে দেওয়ার প্রবণতায় বেসরকারি বিদেশি ঋণ কমেছে।
বিনিয়োগ পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বাধা কাজ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। দেশের ব্যবসায়ীদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, চড়া ব্যাংকঋণের সুদহার (যা ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে উঠেছে), গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট এবং অব্যাহত দুর্নীতি উদ্যোক্তাদের প্রতিনিয়ত ভোগাচ্ছে। বিদ্যমান শিল্পকারখানার উৎপাদন যেখানে ব্যাহত হচ্ছে, সেখানে নতুন ব্যবসা শুরুর চেয়ে বর্তমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী জানান, অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা কমছে এবং প্রধান রপ্তানি খাত হিসেবে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ ও শুল্ক বিরোধের কারণে চীন থেকে বিনিয়োগ স্থানান্তরের সম্ভাবনা থাকলেও বৈশ্বিক মন্দা এবং দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে সেই সুযোগ নেওয়া কঠিন হচ্ছে। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ না পাওয়া ও ঋণের উচ্চ খরচের কারণে নতুন করে বড় বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না উদ্যোক্তারা।
একই বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বিনিয়োগ বাড়াতে নিছক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বা নির্বাচিত সরকারই যথেষ্ট নয়, বিনিয়োগের পথ থেকে প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত বাধাগুলো দূর করতে হবে। প্রজ্ঞাপন জারি করে হঠাৎ নীতি পরিবর্তন করলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট ঘটে। তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসা শুরু ও বের হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি এবং অবকাঠামোগত সেবার মান বাড়ানো জরুরি। ঢাকার বিমানবন্দরে লাগেজ পেতে দেরি বা ট্রলি সংকটের মতো বিষয়গুলো শুরুতেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দেয়। একইভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি ও চুক্তি বাস্তবায়নের আইনি জটিলতা নিরসন করা দরকার।
বৈদেশিক ঋণের ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি প্রসঙ্গে জাহিদ হোসেন আরও বলেন, বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে প্রতিবছর বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই প্রবণতা কমাতে সরকারি ব্যয়ে অপচয় রোধ ও সাশ্রয়ী মনোভাব জরুরি। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে বিদেশি ঋণের চাপ থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব হবে না।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা সংকট দেখা দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আর্থিক খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এ সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন ঠেকানোর পাশাপাশি ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরে। রেমিট্যান্স প্রবাহেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। তবে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।