ইরান ও তার মিত্রদের চালানো হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে চেপে যাওয়া হচ্ছে। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো দেশগুলো হামলার পর যে ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দিয়েছে, তার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতির বড় ধরনের অমিল খুঁজে পাওয়া গেছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর সদর দপ্তর থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা ও বন্দরে হামলার প্রভাব অত্যন্ত গভীর।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরুর পর তেহরান পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের হাজার হাজার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়। এছাড়া ইয়েমেনের হুথি বাহিনীও নিয়মিতভাবে সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা, পাইপলাইন এবং এমনকি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। রয়টার্সের এই মূল্যায়ন উপসাগরীয় দেশগুলোর দেওয়া সরকারি বিবরণের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় আরামকোর ধাহরান সদর দপ্তরে হামলার পর সেটিকে ‘সীমিত অগ্নিকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছিল। তবে রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় ভবনটির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সদর দপ্তরের ওপরের তিনটি তলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী আমিন নাসেরের কার্যালয়ও রয়েছে। এছাড়া ভবনটির ছাদের একাংশ ধসে পড়েছে এবং জানালা ও দরজা উড়ে গেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের ভূখণ্ডে হামলার কথা আংশিক স্বীকার করলেও অনেক সময় ক্ষয়ক্ষতির জন্য আকাশ থেকে পড়ে আসা ধ্বংসাবশেষকে দায়ী করে আসছে। কিন্তু উপগ্রহচিত্র ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ছিল ব্যাপক এবং হামলাকারীরা নিখুঁত নিশানা ব্যবহার করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের ছাদে হামলার ঘটনায় এমনটাই দেখা গেছে, যেখানে চারটি চুল্লির একটিকে জরুরি ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়েছিল। ইরানি ও উপসাগরীয় কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের কাছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা ও উপকেন্দ্রের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ছিল।
একইভাবে কাতারের রাস লাফান এলএনজি স্থাপনায় হামলায় গ্যাস শীতলীকরণের ‘কোল্ড বক্স’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা তৈরি করতে কয়েক মাস সময় প্রয়োজন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরে একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত ৩ মার্চ প্রথম হামলায় দুটি তেলের ট্যাংকে দীর্ঘ সময় আগুন জ্বলেছিল। পরবর্তী হামলায় বন্দরের একটি ‘ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ড’ বা ৬২টি পাইপলাইনের সমন্বয়ে তৈরি স্থানান্তরব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমিরাতের কর্মকর্তারা একে ধ্বংসাবশেষের প্রভাব বললেও ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রামানান কৃষ্ণমূর্তি এটিকে দেশের ‘মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মে মাসে আবারও ড্রোন হামলায় একই অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বন্দরটির রপ্তানি স্বাভাবিক হতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় লেগেছিল।