আগামী শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে বাকি আর মাত্র দুই মাস। এরই মধ্যে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর প্রক্রিয়া চলছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরের বই ছাপানো ও সরবরাহের কাজ দ্রুত গতিতে এগোলেও মাধ্যমিক স্তরে কাজের অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। বছরের শুরুতে সব শিক্ষার্থীর হাতে সব পাঠ্যবই পৌঁছাবে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ছাপানো শেষ করার আশা ব্যক্ত করেছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, নতুন শিক্ষাবর্ষের জন্য সব মিলিয়ে সম্ভাব্য ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩১ কোটির মতো বই প্রস্তুত করা হচ্ছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত বইও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সামগ্রিক চাহিদার মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের জন্য বরাদ্দ ২২ কোটির বেশি বই এবং প্রাথমিক স্তরের জন্য নির্ধারিত রয়েছে প্রায় ৮ কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার পাঠ্যবই।
প্রাথমিক স্তরের কাজের ক্ষেত্রে গত ২০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মোট বরাদ্দের ৮৬ শতাংশেরও বেশি বই ছাপার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাঁধাই, কাটিং এবং প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন (পিডিআই) প্রক্রিয়া শেষে ইতিমধ্যে ৭৪ শতাংশ বই মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ২১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, মাধ্যমিক স্তরে প্রথম দফায় দরপত্র হওয়া ২০ কোটি ৮৪ লাখের বেশি বইয়ের মাত্র ৫০ শতাংশ ছাপা শেষ হয়েছে, এবং আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে পৌঁছানো গেছে মাত্র ৪০ শতাংশ বই। সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে থাকা নবম-দশম শ্রেণির ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সরবরাহের পরিমাণ মাত্র ৩ শতাংশের কাছাকাছি।
চলতি কাজের পাশাপাশি আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি নতুন বিষয় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির বই দুটি হচ্ছে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির বই দুটি ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’। তবে এসব নতুন বইয়ের ছাপার কার্যাদেশ এখনো দেওয়া হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা জানান, ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সভায় অনুমোদন পাওয়া গেলে এগুলোর ছাপার কার্যাদেশ প্রদান করা হবে।
কাজের সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের জানান, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সমুদয় বই ছাপা শেষ করে মাঠপর্যায়ে পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। বর্তমান অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি আশা ব্যক্ত করেন, জানুয়ারিতে নির্ধারিত সময়েই শিক্ষার্থীরা সব পাঠ্যবই হাতে পাবে, যদিও কিছু মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দু-একদিন দেরি হতে পারে।
উল্লেখ্য যে, ২০১০ সাল থেকে নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে সারা দেশে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ কার্যক্রম চালু হলেও বিভিন্ন বছর শিক্ষাবর্ষের শুরুতে পুরো বই পৌঁছানো নিয়ে শঙ্কা দেখা দেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টানা দুই শিক্ষাবর্ষে নির্দিষ্ট সময়ে সব বই সরবরাহ সম্ভব হয়নি। চলতি বছরেও ১০০ শতাংশ বই বিতরণ শেষ করতে শিক্ষাবর্ষ শুরুর পর ১ মাস ৭ দিন লেগেছিল (গত ৭ ফেব্রুয়ারি)। আর তার আগের বছর বিতরণ শেষ হতে প্রায় তিন মাস সময় লেগে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় বিঘ্ন ঘটেছিল।
এদিকে, এনসিটিবি ভবিষ্যতে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুতেও নানা পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়েছে। ২০ ২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ইতিহাসসহ একাধিক বিষয়ে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলী এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া আগামী বছরের নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ যুক্ত করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনায় বিভিন্ন সরকারের আমলে পরিবর্তনের ধারা অনুসরণ করে নতুন বিন্যাস তৈরি করা হয়েছে।
নির্ধারিত সময় অর্থাৎ জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের হাতে সব পাঠ্যবই তুলে দিতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।.এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা যুক্ত করার বিষয় রয়েছে।.আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরিবর্তন আনছে এনসিটিবি।
ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের পাঠ্যবই, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংশোধিত বই এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে প্রস্তুত করা বইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনা তিন ধরনের রূপ পাচ্ছে।.২০২৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষাক্রমে ব্যাপক সংস্কার, প্রাথমিক–মাধ্যমিকে ৪ নতুন বই ও বিষয় : মাহদী আমিন.এ ছাড়া আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।