বিমান বাহিনীর বরখাস্ত হওয়া ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি হত্যা মামলার তদন্তে নেমে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাচ্ছে পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার রাতে উত্তরার বাসা থেকে বের হয়ে তাহসিফ যেসব স্থানে গিয়েছিলেন, সেগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ ইতোমধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি ওই রাতে ঘটনাস্থলের কাছে দায়িত্বে থাকা টহল পুলিশের দলটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে তদন্তকারীরা। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার তাহসিফের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার জামান দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, গত মঙ্গলবার উত্তরার রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। পরদিন বুধবার বিকেলে টঙ্গীর তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। মরদেহের পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়। পরবর্তী সময়ে শুক্রবার রাতে তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন। এর পর হেফাজতে থাকা দীপকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সিসিটিভি ফুটেজ ও পারিপার্শ্বিক তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঘটনার রাতে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার আগে উত্তরার সোনারগাঁও জনপথ রোডের 'নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার'-এ এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময় অবস্থান করেন তাহসিফ ও তার বন্ধু দীপ। সেই সময় তাদের সঙ্গে ২৪-২৫ বছর বয়সি এক তরুণীও উপস্থিত ছিলেন। ফুটেজে গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস পরিহিত ওই নারীর হাতে একটি সাদা রঙের পলিথিন দেখা যায়। আর তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন হেলমেট পরা দীপ। বারটিতে মোটরসাইকেলে চড়ে এসেছিলেন তাহসিফ এবং ফেরার সময়ও মোটরসাইকেলেই রওয়ানা হন। সেখানে তারা তিন বোতল মদ কিনে পান করেছিলেন। পুলিশ ওই তরুণীর নাম-পরিচয় জানতে পারলেও তদন্তের স্বার্থে তা এখনই প্রকাশ করছে না; তবে তাকে আটক করতে পারলে ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ রহস্য উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বার থেকে বের হওয়ার পর তারা টঙ্গীর মাজার বস্তির দিকে যান। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, টঙ্গীর ইজতেমা মাঠের বিদেশি মেহমানখানার পাশে অবস্থিত ভাসমান মাদক বিক্রেতাদের কাছ থেকে তাহসিফ ও দীপ ইয়াবা কিংবা হেরোইন কেনেন এবং সেখানে বসেই তা সেবন করেন। রিমান্ডে থাকা দীপ জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন, সেখানে মাদক সেবনের অভিযোগে টহল পুলিশ তাদের ধাওয়া দিলে তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন এবং দীপ ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পাশে লুকিয়ে থেকে পালিয়ে যান। তবে তদন্তকারীরা দীপের দেওয়া এই বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন না।
ঘটনার রাতে টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশের টহল দলের সঙ্গে দীপের দেখাও হয়েছিল। টহল পুলিশের সদস্যরা জানান, হাজী মাজার বস্তির গেট এলাকায় ঘুরে বেড়ানোর সময় দীপের শরীরে কাদা, ময়লা পানি এবং মলমূত্র লেগে থাকতে দেখে তাকে সন্দেহবশত থামানো হয়। সে সময় দীপ নিজেকে সেনাবাহিনীর 'ক্যাপ্টেন' পরিচয় দিলে পুলিশ সদস্যেরা আর জেরা না করে তাকে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে নির্দেশ দেন। পিবিআই এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলোর ধারণা, দীপ একা অথবা অন্য কারও সহায়তায় তাহসিফকে হত্যা করে থাকতে পারেন এবং ধস্তাধস্তির কারণেই হয়তো তার পোশাকে কাদা ও বর্জ্য লেগেছিল।
ঘটনার সময়ের সমন্বয়ে দেখা গেছে, টহল পুলিশ দীপকে থামানোর কাছাকাছি সময়ে তাহসিফের মোবাইল থেকে তার মাকে একটি ভয়েস মেসেজ দিয়ে বলা হয়েছিল যে তিনি বাসায় ফিরছেন। অন্যদিকে দীপও তার মোহাম্মদপুরের বাসার দারোয়ানকে ফোন করে ফিরতে দেরি হবে জানিয়ে গেট খোলা রাখার অনুরোধ করেছিলেন। এসব হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা ও মোবাইল যোগাযোগের প্রকৃত তথ্য জানতে দুইজনের ফোনই ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
গতকাল শনিবার দুপুরে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে দীপকে হাজির করা হলে বিচারক চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আদালত চত্বরে আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুল হক দিদার সাংবাদিকদের বলেন, ভিকটিম তাহসিফ শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও তুলেছিলেন এবং তা ভাইরাল হয়েছিল। সেই ঘটনার জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কি না এবং এর পেছনে কারা সম্পৃক্ত ছিল তা জানতেই পুলিশ রিমান্ড আবেদন করেছিল।
নৌপুলিশের ঢাকা অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান ও মিডিয়া শাখার পুলিশ সুপার মাসুমা আক্তার জানান, সব দিক বিবেচনায় নিয়েই ছায়া তদন্তকারী সংস্থা পিবিআইয়ের সহযোগিতায় নিরপেক্ষ তদন্ত চালানো হচ্ছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ছাড়া তাহসিফের অনিয়ন্ত্রিত লাইফস্টাইল, বিভিন্ন নারী ও পুরুষের সঙ্গে তার যোগাযোগের বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে শনিবার অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতির (রাওয়া) একটি প্রতিনিধিদল তাহসিফ সাউরির বাসায় গিয়ে পরিবারকে সান্ত্বনা দেয় এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন রাওয়ার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লে. কর্নেল (অব.) আবু নাওয়াজ খুরশিদ আলম এবং সঙ্গে ছিলেন সদস্য মেজর (অব.) আল-আমিনসহ অন্যান্য কর্মকর্তা।
প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৫: ০৯আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৫: ১৩