অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্মরণীয় জয়ের স্মৃতি পেছনে ফেলে ঘরের মাঠে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের নতুন মিশনে চরম ভরাডুবির শিকার হলো বাংলাদেশ। মিরপুরে সিরিজের প্রথম টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ৮ উইকেটে পরাজয় বরণ করেছে স্বাগতিকরা। বৃষ্টি ও আলোকস্বল্পতার বাধা সত্ত্বেও চতুর্থ দিন কাটানোর আগেই ম্যাচ নিজেদের করে নেয় সফরকারীরা। ঘরের মাঠে দায়িত্বহীন ব্যাটিং, দুর্বল ফিল্ডিং ও বোলারদের পরিকল্পনাহীনতায় ধরাশায়ী হয়ে প্রথম টেস্টেই খাদের কিনারায় গিয়ে ঠেকেছে দল।
জয়ের জন্য ১৭০ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে কোনো বেগই পেতে হয়নি ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। টেস্ট ফরম্যাট হলেও শুরু থেকেই টি-টোয়েন্টি বা ওয়ানডের মেজাজে ব্যাটিং চালান ক্যারিবীয় ব্যাটাররা। মাত্র ৩৫.১ ওভারেই ২ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলে সফরকারীরা। ওপেনার ব্র্যান্ডন কিং ১১৫ বলে ৮১ রানের এক চমৎকার অপরাজিত ইনিংস খেলে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছান, যার ইনিংসে ছিল ১০টি চার ও ১টি ছক্কা। তাইজুল ইসলামকে মিড অফের ওপর দিয়ে উড়িয়ে চার মেরে ম্যাচের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি টানেন তিনি। কিংয়ের সঙ্গে ২৭ বলে ৩১ রানে অপরাজিত থাকেন হজ। জয়ের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে উদ্বোধনী জুটিতে ভালো সূচনা পেলেও শরিফুল ইসলামের বলে ৪৯ রান করে বোল্ড হন জন ক্যাম্পবেল। এরপর হাসান মাহমুদ ১২০ রানের মাথায় তেজনারাইন চান্দারপলকে ফিরিয়ে দ্বিতীয় আঘাত হানলেও সেটি বাংলাদেশের হারের পথ আটকাতে পারেনি।
মিরপুরের অসমান বাউন্স ও টার্নিং উইকেটে যেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা ম্যাচজুড়ে ১৬টি উইকেট শিকার করেছেন, সেখানে বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণ ছিল একেবারেই ধারহীন। দলের তিন প্রধান স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ, তাইজুল ইসলাম ও নাঈম হাসান মিলে দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮.১ ওভার বোলিং করে ১২৯ রান দিলেও কোনো উইকেটের মুখ দেখেননি। ফলে গোটা ম্যাচে বাংলাদেশি স্পিনারদের মোট শিকার দাঁড়ায় মাত্র ৮টিতে। মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগে মিরাজের এক ওভারেই ক্যাম্পবেলের বিরুদ্ধে তিনটি এলবিডব্লিউর জোর জোরালো আবেদন উঠলেও আম্পায়ার নিতিন মেনন সেগুলোর একটিতেও সাড়া দেননি। তবে কোনো অবস্থাতেই সফরকারী ব্যাটারদের ওপর চাপ তৈরি করতে সমর্থ হননি স্বাগতিক স্পিনাররা, বিশেষ করে অভিজ্ঞ তাইজুলের বোলিংয়ে ছিল লাইন-লেন্থ ও পরিকল্পনার চরম ঘাটতি।
এর আগে ব্যাটিংয়ে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনে বাংলাদেশ দল। প্রথম ইনিংসে সাদমান ইসলামের সেঞ্চুরির ওপর ভর করে স্বাগতিকদের সংগ্রহ ছিল ২৭২ রান, জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাদের প্রথম ইনিংসে ২৪৫ রানে অলআউট হলে ২৭ রানের লিড পায় বাংলাদেশ। কিন্তু সেই সুবিধাকে কাজে লাগানোর বদলে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটারদের উইকেট বিসর্জনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। চতুর্থ দিনে ৬ উইকেটে ৭৯ রান নিয়ে খেলা শুরু করার পর প্রথম ওভারেই জোমেল ওয়ারিক্যানকে চার মেরে পরের বলেই স্লিপে সহজ ক্যাচ তুলে বিদায় নেন জাকের আলি। এরপর নাঈম হাসানের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ইনিংস ১৪২ রানে থামে। নাঈম নিজের টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতক তুলে নিয়ে পরাজয়ের ব্যবধান কিছুটা কমালেও ওপরের সারির ব্যাটাররা দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। তাওহীদ হৃদয় দুই ইনিংসেই ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে নিজের উইকেট বিলিয়ে এসেছেন, যা টেস্টসুলভ মেজাজের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অন্যদিকে মেহেদী মিরাজও দুই ইনিংসেই ব্যাটে-প্যাডে বড় ফাঁক রেখে স্পিন খেলতে গিয়ে আর্মে বোল্ড হয়ে আউট হন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিক্যান ম্যাচে মোট ৯টি উইকেট তুলে নেন। আর দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৬ রানে ৫ উইকেট নেওয়ার পথে নিজের ক্যারিয়ারের ১০০তম টেস্ট উইকেট স্পর্শ করেন রস্টন চেইস। ব্যাটারদের ব্যর্থতার পাশাপাশি ম্যাচে বাংলাদেশের ফিল্ডিং প্রদর্শনী ছিল চরম হতাশাজনক। ক্যারিবীয়দের প্রথম ইনিংসেই ছয়টি ক্যাচ হাতছাড়া করেন ফিল্ডাররা। চতুর্থ দিনেও সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটে। দ্বিতীয় স্লিপে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ব্র্যান্ডন কিংয়ের ক্যাচ মিস করেন, যার ঠিক পরের বলেই ফিফটি পূরণ করেন কিং। ক্যাচ ছাড়ার পাশাপাশি আঙুলে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন শান্ত। পরে ৭১ রানের মাথায় লং অফে কিংয়ের আরেকটি সহজ ক্যাচ ফেলে দেন ইবাদত হোসেন।
পরিসংখ্যান ও মাঠের পারফরম্যান্স পরিষ্কার করে দিচ্ছে যে মিরপুরে স্বাগতিকদের আত্মসমর্পণের পেছনে ছিল ক্রিকেটারদের মানসিকভাবে পিছিয়ে থাকা ও পরিকল্পনার অভাব। সিলেটে আগামী বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া দ্বিতীয় টেস্টেই সিরিজ বাঁচানোর শেষ সুযোগ পাবে বাংলাদেশ। সফরকারীদের বিপক্ষে ২-০-তে হোয়াইটওয়াশ হওয়া এড়াতে হলে বাংলাদেশ দলকে ক্রিকেটীয় মানসিকতা ও পেশাদারত্বে বিশাল পরিবর্তন এনে মাঠে নামতে হবে।