সাংবাদিকতার দীর্ঘ ৫৬ বছরের ক্যারিয়ারে ২৮ বছর কেটে গেছে প্রথম আলোয়। ১৯৭০ সালের জুলাই মাসে সাপ্তাহিক ‘একতা’ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু হয়েছিল। সেখানে সম্পাদক হিসেবে কেটেছে দীর্ঘ ২১ বছর। সত্তরের দশক ও আশির দশকে দৈনিক সংবাদ, আজকের কাগজ, সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানী, খবরের কাগজ, মূলধারা এবং ইংরেজি সাপ্তাহিক ঢাকা কুরিয়ারে প্রদায়ক ও কলাম লেখক হিসেবে কাজ করা হয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভোরের কাগজে সম্পাদক পদে যোগ দিয়ে ছয় বছরের বেশি সময় ধরে নতুন চিন্তাধারা ও সময়ের উপযোগী সংবাদ পরিবেশন করা হয়। এর পর ১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর প্রথম আলোর আত্মপ্রকাশ ঘটে।
দৈনিক সংবাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ষাটের দশকের শুরুর দিক থেকে। অবশ্য ১৯৫৪ (১৯৫৪) সাল থেকেই দেয়ালে সাঁটানো সংবাদের নিয়মিত পাঠ অভ্যাস গড়ে উঠেছিল, আর বাসায় রাখা হতো দৈনিক আজাদ। তখন মূল আকর্ষণ ছিল খেলার খবর। পুরান ঢাকার বংশাল রোডে সংবাদের কার্যালয় ছিল এবং সেখানেই বসবাস ছিল। ষাটের দশকে সংবাদে কবিতা ও ফিচার লেখা শুরু হয়। সেই দিক বিবেচনায় লেখালেখি ও সাংবাদিকতার বয়স প্রায় ৬৩ বছর পেরিয়ে গেছে।
রাজনৈতিক ভাবনার শুরু কলেজজীবনে। ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইয়ুববিরোধী ছাত্র ধর্মঘটে সরাসরি অংশগ্রহণ করা হয়। পরবর্তী প্রায় ৩০ বছর ছাত্ররাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। পাকিস্তানের সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে ষাটের দশকের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় মুক্তিসংগ্রামে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও গতিধারার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে রাজনীতি ও সাংবাদিকতা একসূত্রে গেঁথে গেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যেমন সাফল্য ও জয় দেখা গেছে, তেমনই বড় বড় ব্যর্থতাও প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। আজ ৮০ বছর বয়সে পৌঁছে দেশের রাজনীতির এক প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সোনালি বারান্দায় দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে।
প্রায় ৬৩ বছরের অভিজ্ঞতা ও ৩০ বছরের সক্রিয় রাজনীতির অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, নানা বিভ্রান্তি ও হতাশার কারণ থাকলেও হতাশাই শেষ কথা নয়। মেঘের আড়ালে সূর্যের অস্তিত্বের মতোই সুন্দর আগামীর স্বপ্ন সবসময় সত্য। একটি সুন্দর দেশ ও সমাজ গঠনের কাজ কঠিন এবং দীর্ঘমেয়াদি হলেও এই দেশের আপামর মানুষের অদম্য শক্তি ও সম্ভাবনা সেই অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারে। সেখানেই সংবাদপত্রের মূল দায়িত্ব ও সাংবাদিকদের করণীয় নিহিত। প্রখ্যাত শিল্পী জয়নুল আবেদিনের ‘সংগ্রাম’ শিল্পকর্মের অদম্য মানুষের মতো বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা মানুষের এই লড়াইয়ের বিনীত সহযোগী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন।
১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর প্রথম আলো প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পেশাদারত্ব, সৃজনশীলতা, সততা ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মূলনীতি ধারণ করে আসা হচ্ছে। নিরপেক্ষভাবে সত্য অনুসন্ধান করা, স্বাধীনভাবে সত্য তুলে ধরা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে গণতান্ত্রিক ও সম্প্রীতিময় বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নই প্রথম আলোর মূল লক্ষ্য। যেখানে নারী, শিশু ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি সব ধরণের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কলম সোচ্চার থাকে। এই নীতির কারণে প্রথম আলো দ্রুত দেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকের স্থান অর্জন করে।
ক্ষমতাকে প্রশ্ন করাই সংবাদমাধ্যমের মূল কাজ। তবে ক্ষমতা তা সহজে মেনে নেয় না। প্রথম আলোর ২৮ বছরের যাত্রায় প্রায় প্রতিটি সরকারের আমলেই বিজ্ঞাপনী নিষেধাজ্ঞা, মামলা, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও নানা নিগ্রহের মুখোমুখি হতে হয়েছে। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রথম আলো কার্যালয়ে বর্বরোচিত হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা স্বাধীন মতপ্রকাশ ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ঝুঁকি বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত করেছে। তবে এসব ধারাবাহিক বা বিচ্ছিন্ন আক্রমণের জবাব প্রথম আলো সব সময় ‘সত্য’ প্রকাশের মাধ্যমেই দিয়ে আসছে।
প্রথম আলো কেবল সংবাদ পরিবেশনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এসিড অপরাধের বিরুদ্ধে আন্দোলন, মাদকবিরোধী কার্যক্রম এবং প্রথম আলো ট্রাস্টের মাধ্যমে দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। দেশের দুর্গম এলাকায় আটটি আলোর পাঠশালা, অদম্য মেধাবী ও অপরাজেয় তারা বৃত্তি এবং রানা প্লাজা সহায়ক তহবিলের মাধ্যমে হাজারো শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দেওয়ার উদাহরণ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বন্ধুসভার মানবিক কাজ, কিশোর আলো, বিজ্ঞানচিন্তা, প্রথমা প্রকাশনের ৯৮৩টি বই পাঠকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া এবং গণিত ও স্বাস্থ্য অলিম্পিয়াডের মতো আয়োজনগুলো সমাজ গঠন ও নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রাখছে।
পাঠক, শুভানুধ্যায়ী, এজেন্ট, হকার ও কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জানানো হয় যে, পাঠক ভালোবাসাই প্রথম আলোর মূল শক্তি। কাজী নজরুল ইসলামের ‘আমার কৈফিয়ত’ কিংবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সবুজের অভিযান’ কবিতার মতো সত্যের পথ চলায় নানা বাধা আসাই স্বাভাবিক। চলন্ত পথে কিছু ক্ষেত্রে সহমত প্রকাশ না করা, অনিয়মে নীরব না থাকা এবং নানা আঘাত সহ্য করেও না থামার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। একই সঙ্গে ২৮ বছরের পথচলায় অনিচ্ছাকৃত কোনো ভুল হয়ে থাকলে তার জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে এবং সত্যের সাধনায় অবিচল থাকার অঙ্গীকার করা হয়েছে।