১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর একই ঘটনায় দুটি ভিন্ন বিচারিক পথ অনুসরণ করা হয়েছিল। ওই ঘটনার পর সেনাবাহিনী নিজস্ব কোর্ট মার্শালে বিদ্রোহে জড়িত সেনা কর্মকর্তাদের বিচার করে এবং ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা বেসামরিক হত্যা মামলাটি দীর্ঘ ২০ বছর ঝুলে থাকার পর কোনো বিচার ছাড়াই শেষ হয়। ৪৫ বছর পর পলাতক আসামি মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন গ্রেপ্তার হওয়ার পর এই দুই ধারার বিচারিক পরিণতির বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
সামরিক বিচার দ্রুত সম্পন্ন হলেও বেসামরিক মামলার তদন্ত দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ১৯৮১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ১৭৩ দফা সময় নিয়েও এই মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করতে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালের ২৪ অক্টোবর আদালতে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে কোনো অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি না করেই মামলাটির নিষ্পত্তি করা হয়।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ২০০১ সালের ৩ অক্টোবর চট্টগ্রামের মুখ্য মহানগর হাকিমের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে পুলিশ জানায়, ১৯৮১ সালের ১৬ জুন অনুষ্ঠিত একটি আন্তঃসংস্থা সমন্বয় (আইসিসি) সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেনাবাহিনী তদন্তের দায়িত্ব নেওয়ায় পুলিশের আর তদন্তের প্রয়োজন ছিল না। মূলত সেনাবাহিনী নিজস্ব বিচার প্রক্রিয়া শুরু করায় বেসামরিক তদন্তটি কার্যত পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। সাক্ষী ও প্রমাণের অভাব দেখিয়ে সিআইডি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিলেও, মূলত ১৯৮১ সালেই তদন্ত প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছিল।
তৎকালীন মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন জানান, সিআইডি তার সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। পরবর্তী পিপি অ্যাডভোকেট আব্দুস সাত্তার জানান, দায়িত্ব নেওয়ার আগেই মামলার নথি রেকর্ডরুমে চলে যায়। বর্তমানে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মফিজুল হক ভূঁইয়া নথি উদ্ধারের জন্য সেরেস্তা, কোতোয়ালি থানা ও চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র, ফরেনসিক প্রতিবেদন কিংবা ময়নাতদন্তের নথির বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ্যে নেই। ১১টি সাবমেশিনগান, তিনটি রকেট লঞ্চার ও তিনটি গ্রেনেড-ফায়ারিং রাইফেল ব্যবহারের তথ্য থাকলেও সেগুলো কীভাবে জব্দ বা সংরক্ষিত হয়েছিল, তা অস্পষ্ট। সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা ব্যবস্থা কীভাবে ভেঙে পড়েছিল, তা নিয়েও রহস্য রয়ে গেছে। গবেষক জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর মতে, হত্যাকাণ্ডের পর গঠিত সামরিক তদন্তের ভিত্তিতে বিচার হলেও বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন কখনো প্রকাশ করা হয়নি।
সাম্প্রতিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের আগে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে বিদ্রোহী কর্মকর্তাদের একটি গোপন বৈঠক হয়, যেখানে প্রায় ২০ জন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ থেকেই তিনি জিয়াউর রহমান ও সেনা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিলেন বলে জানান। হত্যাকাণ্ডের রাতে অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন লে. কর্নেল মতিউর রহমান এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের নিরাপত্তা বলয় এড়িয়ে হামলাকারীরা সার্কিট হাউসে প্রবেশ করেছিল।
বর্তমানে মোজাফফর হোসেনের গ্রেপ্তারের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে যে, দীর্ঘ সময় রেকর্ডরুমে থাকা বেসামরিক মামলার নথি উদ্ধার করে নতুন কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব কি না। প্রবীণ রাজনীতিক একরামুল করিম এই হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ করার দাবি জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মফিজুল হক ভূঁইয়া জানিয়েছেন, যদি বেসামরিক আদালতে পুনরায় বিচারের প্রয়োজন মনে করা হয়, তবে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে তারা পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে আলোচনা করবেন।