বাতাসে ভাসমান অদৃশ্য সূক্ষ্ম ধূলিকণা এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বায়ুদূষণের কারণে সৃষ্ট হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যান্সার ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টের মতো অসংক্রামক ব্যাধিতে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ২৪২ জন মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। এই অকালমৃত্যুর পাশাপাশি কর্মক্ষমতা হ্রাস ও উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের ‘ক্লাইমেট চেইঞ্জ, এয়ার কোয়ালিটি অ্যান্ড হেলথ রিসার্চ ইউনিট’ দীর্ঘ সময় ধরে এই সংকট নিয়ে গবেষণা করছে। সম্প্রতি ইউনিটের একটি গবেষণা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পলিউশন (Pollution) সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই গবেষণায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল—এই ছয়টি বড় শহরের পিএম২.৫ বা সূক্ষ্ম বস্তুকণাজনিত দূষণের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ছয়টি শহরেই বায়ুদূষণজনিত অকালমৃত্যুর হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এই ছয়টি শহরে বছরে মোট ৮৮ হাজার ২৪০ জন মানুষ অকালে মারা যাচ্ছেন। অর্থাৎ প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ২৬০ জন বায়ুদূষণের শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে ৮ হাজার ৩৪৪ জন এবং ফুসফুসের ক্যান্সারে ৮১১ জনের মৃত্যু হচ্ছে প্রতি বছর।
শহরভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার রাজধানী ঢাকা। ঢাকায় বছরে ৬৮ হাজার ৭০৩ জন মানুষের অকালমৃত্যু পিএম২.৫ দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এছাড়া চট্টগ্রামে ১১ হাজার ২০২ জন, রাজশাহীতে ২ হাজার ৮২৭ জন, খুলনায় ২ হাজার ৬২৫ জন, সিলেটে ১ হাজার ৪৮৮ জন এবং বরিশালে ১ হাজার ৩৯৫ জন অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন। ঢাকায় প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৪৮৪ জন অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যা নগরের বায়ুমানের দ্রুত অবনতির ইঙ্গিত দেয়।
গবেষকদের হিসাবে, বায়ুদূষণের কারণে বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় পাঁচ শতাংশের সমান। গবেষক দলের প্রধান মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বায়ুদূষণ কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকট। তিনি সতর্ক করে বলেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
এই সংকট মোকাবিলায় গবেষকরা পিএম২.৫ নির্গমন কমাতে প্রমাণভিত্তিক নীতি গ্রহণ, শিল্প ও যানবাহনসহ দূষণের বিভিন্ন উৎস নিয়ন্ত্রণ এবং নগরাঞ্চলে সমন্বিত বায়ুমান ব্যবস্থাপনা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।