এক সময় উচ্চমূল্য ও ফলনশীল চারার জন্য বিদেশ নির্ভরতা থাকলেও এখন আধুনিক টিস্যু কালচার প্রযুক্তির কল্যাণে দেশেই মিলছে জি-৯ কলা, এমডি-২ আনারস, জারবেরা, লিলিয়াম ও অর্কিডের মতো উন্নত চারা। আগে আমদানিকৃত চারার দাম বেশি হওয়ার পাশাপাশি রোগবালাইয়ের ঝুঁকি থাকত, তবে সরকারি গবেষণাগারে উৎপাদিত রোগমুক্ত চারা সেই চিত্র বদলে দিচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উদ্যোগে পরিচালিত ‘টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প’ দেশের উদ্যান খাতে নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে।
বর্তমানে মাদারীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহে তিনটি ল্যাব সক্রিয় রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইংয়ের তথ্যমতে, গত এক বছরে এসব ল্যাবে দুই লাখ ১২ হাজার ৩৮৭টি চারা উৎপাদিত হয়েছে, যার মধ্যে এক লাখ ৯২ হাজার ৬৩৭টি কৃষক ও উদ্যোক্তাদের মাঝে বিক্রি করা হয়েছে। এর মধ্যে মাদারীপুর ল্যাবে ৯০ হাজার ২৩৭টি, বগুড়ায় ৬২ হাজার ৫০০টি এবং ময়মনসিংহে ৫৯ হাজার ৬৫০টি চারা উৎপাদন করা হয়েছে। চাহিদা বাড়ায় আগামী অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়ানো হয়েছে।
ল্যাবের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে কৃষিবিদ এনামুল হক জানান, উন্নত মাতৃগাছ থেকে সংগৃহীত টিস্যু জীবাণুমুক্ত পরিবেশে পুষ্টিমাধ্যমে স্থাপন করে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে হাজার হাজার চারা তৈরি করা হয়। ল্যাবে উৎপাদিত চারাগুলো পলি হাউস ও হার্ডেনিং জোনে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পর কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এতে চারাগুলো রোগমুক্ত ও মাতৃগাছের গুণাগুণসম্পন্ন হয়। উদাহরণ হিসেবে, ভারত থেকে আমদানি করা জারবেরা চারার দাম যেখানে ৮০ থেকে ১০০ টাকা, সেখানে সরকারি ল্যাবের চারা মাত্র ৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া মাদারীপুর ল্যাবে প্রথমবারের মতো আট হাজার লিলিয়াম চারা উৎপাদিত হয়েছে, যা সামনে ২০ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই প্রকল্পটি কেবল চারা উৎপাদন নয়, বরং কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি ও নার্সারি শিল্পকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে বান্দরবান, সাভার, কুমিল্লা, ভোলা ও টাঙ্গাইলে আরও পাঁচটি আধুনিক ল্যাব নির্মাণাধীন রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম জানান, মানসম্মত ও রোগমুক্ত চারা নিশ্চিত করা আধুনিক কৃষির দাবি। প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর উল্লেখ করেন, জি-৯ কলার ক্ষেত্রে এই চারা ব্যবহার করে প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষিবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এমএ রহিম বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যতে রপ্তানিমুখী উদ্যান শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব হবে।