প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জালের মতো ছড়িয়ে থাকা খালের জন্য একসময় পরিচিত ছিল বরিশাল। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল আর ভরাটের কারণে ঐতিহ্যবাহী এই শহরটি এখন দিন দিন তার বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। একের পর এক খাল ও জলাশয় বিলীন হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো শহর জলমগ্ন হয়ে পড়ছে। পরিবেশগত এই বিপর্যয় বরিশালকে ক্রমশ রাজধানী ঢাকার মতোই এক সংকটাপন্ন শহরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বরিশাল শহরে একসময় ২৪টি খাল ছিল, যার মধ্যে এখন মাত্র ৪টি খালে পানির প্রবাহ টিকে আছে। বাকি খালগুলোর মধ্যে ৭টির কোনো অস্তিত্বই নেই এবং ১৩টি মৃতপ্রায়। মোটামুটি টিকে থাকা খাল চারটি হলো সাগরদী খাল, জেল খাল, আমানতগঞ্জ খাল ও মোহাম্মদপুর খাল। এর মধ্যে ২০২৩ সালে সাগরদী খালটি খনন করায় সেটির অবস্থা কিছুটা ভালো। অন্যদিকে নাপিতখালী, ভাটার, নবগ্রাম, চাঁদমারী, ভেদুরিয়া, কলাডেমা, সাপানিয়া, কাশীপুর, সোলনা, ভাড়ানি, পুডিয়ার খাল, উত্তর নবগ্রাম সাগরদী, ঝোড়াখালী, তাজকাঠি, চৌপাশা ও শোভারানী খালের অস্তিত্ব এখন বিলীন হওয়ার পথে।
খালের এই করুণ দশার একটি বড় উদাহরণ নবগ্রাম খাল। ঝালকাঠির কালিজিরা নদী থেকে শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কীর্তনখোলা নদীতে মিশেছিল এই খাল। একসময় এই খালে কৃষকেরা ডিঙিনৌকায় করে সবজি নিয়ে বটতলা বাজারে আসতেন। কিন্তু ২০০২ সালে সড়ক দুই লেন করার জন্য সিটি করপোরেশন খালটি ভরাট করে এম এ জলিল সড়ক নির্মাণ করে। এখন সামান্য বৃষ্টি হলেই এই সড়কে পানি জমে যায়। একইভাবে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ জেল খালটি কীর্তনখোলা নদী থেকে শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে গেলেও বর্তমানে তা বর্জ্য ও অবৈধ দখলে জর্জরিত। হাটখোলা এলাকায় কাঁচাবাজার ও মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের বর্জ্যে খালটি সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং দুই পাড়ে আরসিসি পিলার দিয়ে অসংখ্য ভবন তৈরি করা হয়েছে। কাউনিয়া এলাকার বাসিন্দা জাহিদুর রহমান এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি জীবন্ত খালকে এভাবে চোখের সামনে গলা টিপে মেরে ফেলা দেখে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ‘রান’-এর প্রধান নির্বাহী রফিকুল আলম জানান, দীর্ঘদিন ধরে খাল উদ্ধারের দাবি জানানো হলেও তা উপেক্ষিত রয়ে গেছে, যা বরিশালকে অচিরেই বসবাসের অযোগ্য করে তুলবে।
খালের পাশাপাশি বরিশাল শহরের পুকুর ও দিঘিগুলোও দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে শহরে একসময় প্রায় দুই হাজার পুকুর ও দিঘি ছিল। ২০১১ সালের বরিশাল সিটির মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী সরকারি ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পুকুর ছিল ৪৩৬টি, যা এখন কমে ২০০-এর নিচে নেমে এসেছে। বেসরকারি পর্যায়ে থাকা দেড় হাজার পুকুরের প্রায় সবগুলোই ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কাউনিয়ার মনসাবাড়ি এলাকায় একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুর ভরাট করা হয়। এর আগে hospital রোডের মা ও শিশুকল্যাণকেন্দ্রের পুকুর এবং কাশীপুরের শতবর্ষী সীতারামের দিঘি ভরাট করা হয়েছে। এমনকি বরিশাল মডেল স্কুল ও কলেজ নির্মাণের সময় নাপিতের খালের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশাল দিঘি ভরাট করা হয়। পুলিশ লাইনসের পুকুর অর্ধেক ভরাট করা হয়েছে এবং অশ্বিনীকুমার দত্তের বাসভবনের সামনের ঐতিহাসিক পুকুরটি এখন ছোট ডোবায় পরিণত হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে রূপাতলী হাউজিং এস্টেট-সংলগ্ন জেলা প্রশাসনের মালিকানাধীন শতবর্ষী লালার দিঘির একাংশ ভরাট করে প্লট তৈরির উদ্যোগ নেয় জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে রূপাতলী হাউজিং এস্টেটের উপবিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, দিঘির দক্ষিণ পাড়ে ১৯৭৭-৭৮ সালে অধিগ্রহণ করা তাদের ৫০ শতক জমি ভেঙে দিঘিতে পড়েছিল, যা তারা ভরাট করে পুনরুদ্ধার করেছেন। পাড় ভরাট করায় পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে তিনি জানান। তবে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বরিশালের সমন্বয়ক লিংকন বায়েন বলেন, জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ ও বাংলাদেশ ওয়াটার অ্যাক্ট ২০১৩ অনুযায়ী জলাশয় ভরাট দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এর শ্রেণী পরিবর্তন করা আইনত সম্ভব নয়।
জলাশয় কমে যাওয়ার প্রভাবে গত এক দশক ধরে সামান্য বৃষ্টিতেই বরিশালের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, যা কীর্তনখোলা নদীর জোয়ারের কারণে আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। আমির কুটির এলাকার বাসিন্দা শামীমা আক্তার জানান, বর্ষা এলে ঘরের বাইরে বের হওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। জলাশয় কমে যাওয়ায় শহরের মানুষ এখন পুরোপুরি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সিটি করপোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ডে প্রতিদিন পানির চাহিদা ৫ কোটি ২৬ লাখ লিটার হলেও সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২ কোটি ৪০ লাখ লিটার, যার পুরোটাই তোলা হয় ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। ফলে প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি লিটার পানির ঘাটতি থাকছে। এই ঘাটতি মেটাতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে গভীর নলকূপের সংখ্যা ৫০ হাজারে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দুই দশক আগেও বরিশালে ৭৮০ থেকে ৮২০ (820) ফুট এবং ৮৮০ (880) থেকে ৯৩০ ফুট গভীরতায় সুপেয় পানি পাওয়া যেত। কিন্তু অতিরিক্ত পানি তোলার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামছে বলে জানান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমরান তরফদার। তিনি বলেন, এখন ৯৫০ ফুটের নিচে না গেলে সুপেয় পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
জলাশয় ও গাছপালা কমে যাওয়ায় বরিশালের তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আবদুল্লাহ সালমানের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৬০ বছরে বরিশালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে ০.৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বছরে গড়ে বৃষ্টিপাত কমেছে ০.১৮ মিলিমিটার হারে। তিনি সতর্ক করেছেন যে, বরিশাল দ্রুত উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর দিকে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বড় তাপপ্রবাহের ঝুঁকি তৈরি করবে।
পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত শহর গড়ে তুলতে ২০১১ সালে একটি মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল যা ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা ছিল, তবে এর অগ্রগতি খুবই সামান্য। নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর বরিশালের নগর-পরিকল্পনাবিদ মো. বায়েজিদ জানান, নতুন সমন্বিত পরিকল্পনায় শহরের আয়তন ৫৮ বর্গকিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ১০৩ বর্গকিলোমিটার করা হয়েছে। তবে পরিকল্পনা সত্ত্বেও শহরটি অপরিকল্পিতভাবেই বেড়ে উঠছে।
১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বরিশাল পৌরসভা ১৮৭৬ সালে মিউনিসিপ্যালিটি এবং ২০০২ সালে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়। বর্তমানে এই শহরের জনসংখ্যা ছয় লাখের বেশি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট গ্রুপের গবেষণা বিভাগ ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) তৈরি করা ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে বলা হয়েছে, বিশ্বের ১৭৩টি (173) শহরের মধ্যে বাসযোগ্যতার দিক দিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দামেস্ক ও ত্রিপোলি শহরের পরেই রয়েছে ঢাকা। বরিশালও এখন সেই একই নেতিবাচক ধারায় ধাবিত হচ্ছে। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রিন মুভমেন্ট’-এর সঙ্গে যুক্ত কাজী মিজানুর রহমান শৈশবের স্মৃতিচারণা করে বলেন, একসময় সবুজ প্রকৃতি আর খালের অপার্থিব আবহ ছিল এই শহরে, যা এখন শুধুই উষ্ণ আর ক্লান্ত এক পরিবেশে রূপ নিয়েছে। ১৯৬৭ সাল থেকে বরিশালে বসবাসকারী সরকারি ব্রজমোহন কলেজের অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, শহরে আগে যে প্রাণ ছিল তা এখন আর নেই। তবে অন্য শহরের তুলনায় এখনো যেটুকু স্বস্তি অবশিষ্ট আছে, তা টিকিয়ে রাখতে সবাইকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে।
বরিশাল পৌরসভার গোড়াপত্তন হয়েছিল ১৫৭ বছর আগে—১৮৬৯ সালে।
সিটি করপোরেশনের হিসাবে এ সংখ্যা ৫ হাজার হলেও ২০২২ সালে বাপার এক গবেষণায় দেখা যায়, এমন নলকূপের সঙ্গে প্রায় ৩৫ হাজার।