বর্তমানে বাজারে সিন্ডিকেট ও অবৈধ মজুতদারির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চড়া দামের বাজারে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেককেই সংকোচ কাটিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কিনতে দেখা যাচ্ছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা সরকারের বেঁধে দেওয়া মূল্যের সুযোগ নিয়ে পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয় এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আকাশচুম্বী দামে তা বিক্রি করে। গুটিকয়েক মানুষের এই অনৈতিক অতি মুনাফার লোভ সাধারণ জনগণকে চরম ভোগান্তির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী এই সিন্ডিকেট ও মজুতদারির বিরুদ্ধে ইসলামে রয়েছে কঠোর হুঁশিয়ারি ও নিষেধাজ্ঞা।
ইসলামি পরিভাষায় মজুতদারিকে ‘আল-ইহতিকার’ বলা হয়। প্রথম আরবি অভিধান প্রণেতা খলিল ইবনে আহমদ আল-ফারাহিদি (রহ.)-এর মতে, খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যজাত অন্যান্য জিনিস মূল্যবৃদ্ধির আশায় জমা করে রাখাকেই ইহতিকার বা মজুতদারি বলা হয় (আল-আইন : ৩/৬২)। এ প্রসঙ্গে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) ফাতহুল বারিতে (৪/৪৪০) লিখেছেন, নিজের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও এবং জনগণের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্য বিক্রি না করে আটকে রাখাই হলো সিন্ডিকেট বা মজুতদারি। অন্যদিকে, ইমাম আওজায়ি (রহ.) নাইলুল আওতারে (৩/৬০৫) উল্লেখ করেছেন, বাজারে পণ্য সরবরাহের পথে যে বাধা সৃষ্টি করে এবং মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্য মজুত করার জন্য বাজার থেকে পণ্য কিনে নেয়, সে-ই প্রকৃত মজুতদার।
ইসলামে অতি মুনাফার উদ্দেশ্যে খাদ্যসামগ্রী মজুত করাকে সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েজ ঘোষণা করা হয়েছে। এটি ইসলামের সুষম বণ্টন ব্যবস্থার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘শুধু পাপী ব্যক্তিই মজুতদারি বা সিন্ডিকেট করে থাকে’ (সহিহ মুসলিম : ১৬০৫)। ইসলামি আইনবিদদের মতে, বাজারে দাম কম থাকা অবস্থায় পণ্য কিনে গুদামজাত করা এবং সংকটের সময় চড়া দামে বিক্রি করা সব মাজহাবের মতেই নিষিদ্ধ (আল-ফিকহুল মুয়াসসার : ৬/৪৫)। এই অনৈতিক চর্চার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়, যা ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না।
সব ধরনের পণ্য বা যেকোনো উপায়ে মজুত করাই কি নিষিদ্ধ? এ বিষয়ে ইমাম আবু দাউদ (রহ.) একবার ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কোন জিনিস গুদামজাত করা নিষেধ? উত্তরে তিনি জানান, মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস, অর্থাৎ যার ওপর মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল, সেখানে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হারাম (আল-জামে লি উলুমি ইমাম আহমদ : ৯/১৫৯)। বিশেষ করে মানুষের জীবনধারণের জন্য জরুরি খাদ্যশস্য ও নিত্যপণ্য বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে আটকে রাখা সম্পূর্ণ অবৈধ।
সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর মজুতদারিকে ইসলাম হারাম সাব্যস্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—কম দামে পণ্য কিনে বেশি লাভের আশায় গুদামজাত করা যা বাজারে প্রভাব ফেলে, চরম সংকটের সৃষ্টি করে এমন পরিমাণে পণ্য আটকে রাখা, খাদ্য সংকটের সময়ে যেকোনো পরিমাণ খাদ্য মজুত করা এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করা। এই সিন্ডিকেট কেবল খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং গণপরিবহন যেমন গাড়ি, লঞ্চ বা ট্রেনের টিকিটের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। টিকিট থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করাও এক ধরনের জুলুম। এই সিন্ডিকেটের ফলে মধ্যস্বত্বভোগী ও মালিকপক্ষ লাভবান হলেও সাধারণ মানুষ মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যেসব লোক বিনা দোষে মুমিন পুরুষ ও নারীকে কষ্ট দেয়, তারা অতি বড় একটা মিথ্যা অপবাদ ও সুস্পষ্ট গুনাহের বোঝা নিজেদের মাথায় তুলে নেয়’ (সূরা আহজাব : ৫৮)।
অবৈধ মজুতদারদের জন্য ইসলামে দুনিয়া ও আখিরাতে ভয়াবহ শাস্তির কথা বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মজুতদারদের অভিশপ্ত বা লানতপ্রাপ্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমদানিকারক রিজিকপ্রাপ্ত আর মজুতদাররা লানতপ্রাপ্ত’ (মুসনাদে দারেমি : ২৫৮৬)। অন্য একটি হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যদ্রব্য মজুত করে, আল্লাহ তাকে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত করবেন অথবা দেউলিয়া বানাবেন’ (আল-মুন্তাখাবুল আদাবি : ১৭)। এছাড়া সহিহ মুসলিমের ১২২৮ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) পুনরায় সতর্ক করে বলেছেন যে, পাপিষ্ঠ ছাড়া কেউ মজুতদার হতে পারে না। অতএব, দুনিয়ার সামান্য লাভের জন্য আল্লাহর অভিশাপ ও কঠিন রোগ বা দেউলিয়াপনার মতো ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
যেসব ক্ষেত্রে মজুতদারি হারাম : সকল মজুতদারি হারাম নয়। এজন্য জানতে হবে, সমাজে প্রচলিত কোন ধরনের মজুতদারি হারাম। কিছু হারাম মজুদদারির ধরন তুলে ধরা হলো- ১. স্বল্পমূল্য চলাকালে খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করে বেশি লাভের আশায় এমনভাবে গুদামজাত করা, যার ফলে বাজারে তার প্রতিক্রিয়া পড়ে। ২. কোনো দ্রব্য এমন পরিমাণে গুদামজাত করা, যে কারণে ক্