কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতকে কেন্দ্র করে বেইজিং নতুন ভূরাজনৈতিক বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে। গত শুক্রবার চীনের সাংহাই শহরে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী ‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলন’ (ডব্লিউএআইসি)। সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এআই খাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এআই প্রযুক্তি যেন কোনো একটি দেশের একচ্ছত্র আধিপত্যের হাতিয়ার হয়ে না ওঠে। বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত করে করা হয়েছে, কারণ প্রযুক্তি ও এআই খাতে বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে।
সম্মেলনের ঠিক একদিন আগে বৃহস্পতিবার ‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থা’ (ডব্লিউএআইসিও) গঠনের ঘোষণা দেয় চীন। আনুষ্ঠানিকভাবে গত ১৬ জুলাই গঠিত এই আন্তঃসরকারি সংস্থাটি ২০২৫ সালের মধ্যে এআই সংক্রান্ত বৈশ্বিক নীতিমালা প্রণয়নে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। সাংহাইয়ে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে ২৯টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা স্বাক্ষর করেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ডব্লিউএআইসি সম্মেলনের এটি নবম আসর, যার এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে এআই অংশীদারত্ব’।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সি চিন পিং বলেন, এআই উন্নয়ন কোনো একক দেশের প্রদর্শনী হওয়া উচিত নয়, বরং এটি হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি সিম্ফনি। তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআই সক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রে ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে কোনো দেশ যেন অন্য দেশের ওপর নিজের নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা না করে। এছাড়া এআই প্রযুক্তির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য উপযুক্ত বিধিবিধান ও নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
ডব্লিউএআইসিও নামক এই নতুন আন্তঃসরকারি সংস্থার লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং এমন নীতিমালা প্রণয়ন করা, যা প্রযুক্তিকে নিরাপদ ও জনবান্ধব করবে। এই জোটের ২৯টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সেনেগাল, রাশিয়া ও পাকিস্তানের মতো ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, জাতিসংঘে এআই সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের জন্য বেইজিং এই জোটকে একটি কৌশলগত মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
চীন বর্তমানে নিজস্ব এআই পরিবেশ গড়ে তুলতে চিপ উৎপাদন থেকে শুরু করে ডেটা সেন্টার পর্যন্ত বিপুল বিনিয়োগ করছে। যদিও আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরির ক্ষেত্রে চীন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পিছিয়ে আছে, তবুও ডেটা সেন্টারের সক্ষমতা এবং বিরল খনিজ সম্পদের ওপর আধিপত্য তাদের বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। এছাড়া সস্তা বিদ্যুতের প্রাচুর্য দেশটিকে এআই মডেল প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে এগিয়ে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে চীনে চিপ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, যার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে চীনও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি রপ্তানি সীমিত করেছে। সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোকে নিয়ে চীন যে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক এআই দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলছে, তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।