চলতি মাসে আফগানিস্তানের কাবুল থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের পাঁচ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর মার্কিন বাহিনীর প্রস্থান যে বিশৃঙ্খলার জন্ম দিয়েছিল, তা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর ন্যাটো-সমর্থিত মার্কিন আগ্রাসনের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই অভিযান বর্তমানে একটি চরম ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হয়। দীর্ঘ দুই দশকের এই যুদ্ধে ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি মার্কিন ও ৪৫০ জন ব্রিটিশ সেনার প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া হাজার হাজার বেসামরিক মানুষও এই যুদ্ধে নিহত হন, যাদের সঠিক সংখ্যা আজও অজানা। আল-কায়েদাকে পরাস্ত করার দাবি করা হলেও তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে তাদের দমনমূলক শাসন শুরু করেছে, যা পশ্চিমের অবিবেচনাপ্রসূত হস্তক্ষেপের ব্যর্থতার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
ন্যাশনাল ওয়ার কলেজের অধ্যাপক কার্টার মালকাসিয়ান, যিনি আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর বেসামরিক উপদেষ্টা ছিলেন, মনে করেন যে দীর্ঘ ২০ বছর দেশটিতে সেনা রাখার মূল যুক্তিটিই ছিল ত্রুটিপূর্ণ। সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার আশঙ্কায় সেখানে মার্কিন বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল, কিন্তু গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একটিও সন্ত্রাসী হামলা হয়নি। এই যুদ্ধের পেছনে ওয়াশিংটন প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে এবং ৭ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করেছিল—সবই ছিল অতিরঞ্জিত এক হুমকির ভয়ে।
ইরাকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভুল চিত্র দেখা গিয়েছিল। ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ দাবি করেছিলেন, সাদ্দাম হোসেনের সরকারের কাছে রাসায়নিক ও জৈবিক অস্ত্রের মজুত রয়েছে এবং তারা পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সেখানে আগ্রাসন চালায় এবং সামান্য লাভের আশায় ব্যাপক ক্ষতি করে ২০১১ সালে তারা সেখান থেকে বিদায় নেয়। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কস্টস অব ওয়ার প্রকল্পের তথ্যমতে, ২০০১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন ও পাকিস্তানে নাইন-ইলেভেন–পরবর্তী সহিংসতায় আনুমানিক ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান নীতি দেখে মনে হচ্ছে, সেই একই বিপর্যয়কর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ট্রাম্প ইরান-সম্পর্কিত হুমকিকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করছেন, ঠিক যেমনটা বুশ করেছিলেন ইরাকের ক্ষেত্রে। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কোনো শক্ত প্রমাণ নেই, তবুও ট্রাম্পের ‘ছোটখাটো অভিযান’ হিসেবে অভিহিত করা কার্যক্রমটি ষষ্ঠ মাসে গড়িয়েছে এবং এর পরিধি দ্রুত বাড়ছে। রাজনৈতিক অসততা, অতি আত্মবিশ্বাস এবং ভুল নেতৃত্বের ওপর ভর করে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ছায়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। ভেনেজুয়েলা, কিউবা বা কলম্বিয়ার মতো প্রতিবেশীদের প্রতি ট্রাম্পের বৈরী আচরণের মূলে রয়েছে পশ্চিম গোলার্ধে কর্তৃত্ব ফলানোর সেই আদি বিশ্বাস, যা এখন বিশ্বব্যাপী ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের নেশায় রূপ নিয়েছে।