প্রশাসনে তীব্র অসন্তোষ ও আপত্তির মুখে সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত থেকে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে পিছু হটেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। গত ৯ জুলাই সুদমুক্ত ঋণে কেনা গাড়ির মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ৫০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ১৬ জুলাই তা প্রত্যাহার করে আগের হার বহাল রাখা হয়। সরকারের এই পিছু হটাকে আমলাতন্ত্রের কাছে 'অসহায় আত্মসমর্পণ' বলে আখ্যা দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গত ৯ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে দেওয়া এক চিঠিতে অর্থ মন্ত্রণালয় গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করে। চিঠিতে দেশের চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সীমিত সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যুক্তি দেওয়া হয়। তবে ওই চিঠিতে সরাসরি 'প্রধানমন্ত্রীর সদয় নির্দেশনা' থাকার কথা উল্লেখ করা হয়, যা সচিবালয় নির্দেশমালার ১৫০(১) অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দাপ্তরিক চিঠিতে সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগতভাবে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ না দেখিয়ে 'সরকারের সিদ্ধান্ত' হিসেবে উল্লেখ করতে হয়। এতে সিদ্ধান্তের দায় প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপানো হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কর্মকর্তারা।
একই দিনে আরেকটি চিঠির মাধ্যমে উপসচিব ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকার সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা বন্ধের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এর পাশাপাশি পূর্ণ বৃত্তি পাওয়া কর্মকর্তাদের পড়াশোনার জন্য প্রেষণের (ডেপুটেশন) পরিবর্তে শিক্ষা ছুটি দেওয়ার আরেকটি প্রস্তাব পাঠানো হয়, যা কার্যকর হলে কর্মকর্তাদের বেতন অর্ধেক হয়ে যেত। এসব সিদ্ধান্তের কারণে বেসামরিক প্রশাসনের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার ২০০ কর্মকর্তা এই গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধার আওতায় রয়েছেন, যার মধ্যে ২ হাজার ৫০০ জন বেসামরিক কর্মকর্তা, ৩ হাজার ৫০০ জন সশস্ত্র বাহিনীর, ৮০০ জন বিচার বিভাগের এবং ৪০০ জন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা।
প্রশাসনের এই ক্ষোভের মুখে গত ১৬ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন চিঠি দিয়ে জানায় যে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ৫০ হাজার টাকাই বহাল থাকছে। এ ঘটনার পর ১৯ জুলাই ওই চিঠিতে স্বাক্ষরকারী অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেনকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। তবে শুধুমাত্র একজন মধ্যম সারির কর্মকর্তাকে বদলি করা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেই নানা প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশের চলমান আর্থিক সংকটের মধ্যে একশ্রেণির সুবিধাভোগী কর্মকর্তার অসন্তোষের মুখে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা স্বাভাবিক নয়; বরং এটি আমলাতন্ত্রের কাছে সরকারের অসহায় আত্মসমর্পণেরই বহিঃপ্রকাশ।
এদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতি ও ভুল-বোঝাবুঝি নিরসনে অর্থ মন্ত্রণালয়কে গাড়ি সংক্রান্ত দুটি বিকল্প প্রস্তাব নতুন করে পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর একটি হলো কর্মকর্তাদের সরকারি গাড়ি, চালক ও জ্বালানি সুবিধা দেওয়া, এবং অন্যটি হলো বিদ্যমান সুদমুক্ত ঋণের পদ্ধতি বজায় রাখা। এই দুটির মধ্যে কোনটি বেশি সাশ্রয়ী, তা মূল্যায়ন করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে সরকারি পরিচালন ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে এই গাড়ি সেবা নগদায়ন নীতিমালা চালু করা হয়েছিল।