বৈষম্যবিরোধী গণ-আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রাক্কালে বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই সেরনিয়াবাত খোকন আব্দুল্লাহর দেশত্যাগ নিয়ে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, পালিয়ে যাওয়ার সময় তিনি গাড়িভর্তি করে প্রায় ১৬ কোটি টাকা সঙ্গে নিয়ে যান। পরবর্তীতে সেই অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তার ছেলের কাছে পাঠানো হয়।
ঘটনার সূত্রপাত ৪ আগস্ট, যখন বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা টুটুল চৌধুরী ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে গুলি ছুড়তে গিয়ে গণপিটুনিতে নিহত হন। এই ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে খোকন ওই রাতে তার আলেকান্দা সড়কের ভাড়া বাসায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতাদের ডেকে বরিশাল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ৪ আগস্ট রাত ১২টায় বরিশাল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ৩ ঘণ্টা প্রস্তুতির পর তিনি ও তার স্ত্রী লুনা আব্দুল্লাহ বরিশাল ত্যাগ করেন।
বরিশাল ছাড়ার আগে প্রস্তুতি হিসেবে তিনি ঘরে থাকা নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার ব্যাগে ভরেন। তার তৎকালীন এপিএস রুবেলের তথ্যমতে, সেই ব্যাগে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ছিল। বরিশাল থেকে সরাসরি খুলনায় গিয়ে শ্যালক মিঠুর বাড়িতে ওঠেন তারা। এরপর তিনি খুলনায় প্রভাবশালী এক বিএনপি নেতার বাসায় আশ্রয় নেন, যেখানে ২০২৪ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত অবস্থান করেন।
খুলনায় আত্মগোপনে থাকা অবস্থায়ও তিনি দুর্নীতির জাল বিস্তার করেন। বিসিসির বেশ কয়েকজন ঠিকাদারের পাওনা প্রায় ২৭ কোটি টাকার চেকে ব্যাক ডেটে সই করেন তিনি। তৎকালীন এপিএস রুবেল ও বিসিসির প্রকৌশল ও হিসাব শাখার দুই কর্মকর্তার সহায়তায় এই কাজ সম্পন্ন হয়। প্রতিটি চেক সইয়ের বিনিময়ে তিনি বিলের ২০ থেকে ৪০ শতাংশ টাকা হাতিয়ে নেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও কেবল শেখ পরিবারের কোটায় লোকদেখানো নির্বাচন করে মেয়র বানানো হয় খোকনকে। মাত্র ৭ মাসের দায়িত্ব পালনকালে নানাভাবে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের তদন্ত করছে দুদক।
দেশ ছাড়ার আগে কয়েকবার ব্যর্থ হয়ে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে সিলেটের তামাবিল সীমান্ত দিয়ে তিনি ভারতে প্রবেশ করেন। আসাম ও কলকাতা হয়ে অবশেষে ডিসেম্বরের শুরুতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। যুক্তরাষ্ট্রে টাকা নিতে হলে যেহেতু অর্থের উৎস জানাতে হয়, তাই সিঙ্গাপুরে খোলা নামসর্বস্ব কোম্পানির মাধ্যমে সেখানে টাকা পাঠাতেন খোকন। মেয়র হওয়ার পর থেকে ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত যত টাকা হাতিয়েছেন, তার সিংহভাগ এভাবেই পাচার হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। কলকাতায় অবস্থানকালে ১ মাসের জন্য একটি গাড়ি ভাড়া নেন খোকন। ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর এই দম্পতিকে কলকাতার এক্সেস মলে দেখা গেছে। বর্তমানে খোকন আব্দুল্লাহ তার ছেলে প্রত্যুষ সেরনিয়াবাতের সঙ্গে টেক্সাসে অবস্থান করছেন। সেখানে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও পেট্রোল পাম্প ব্যবসায় বিনিয়োগ করে নাগরিকত্ব পাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।