ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একের পর এক বোমাসদৃশ বস্তু ও শক্তিশালী বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অতি সম্প্রতি মতিঝিল, মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশন এবং সাভারের আশুলিয়ায় এসব ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে দুটি ঘটনায় সরাসরি ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) বা তাজা বোমা উদ্ধার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে অন্য দুটি স্থানে পরীক্ষা করে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। এ ধরনের ধারাবাহিক ঘটনার পেছনে কোনো বিশেষ মহলের জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক জানিয়েছেন, মতিঝিল ও আশুলিয়ার বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় জড়িত কাউকে এখন পর্যন্ত শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে সিটিটিসিসহ পুলিশের একাধিক দল তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের গ্রেপ্তারের পরেই স্পষ্ট হবে কারা এবং কেন এই নাশকতার চেষ্টা চালিয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি জানান, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিটিটিসি সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে এবং উগ্রবাদী ও অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর ওপর গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ঘটনায় আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। দুষ্কৃতিকারী চক্র কেবল ভয় ও বিভ্রান্তি ছড়াতে এই অপচেষ্টা চালাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে পুলিশ জানায়, গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পরিত্যক্ত একটি ছাতার ভেতর থেকে ১ থেকে ১.৫ কেজি ওজনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাইপ বোমা উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বোম ডিসপোজাল ইউনিট। সেটি নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করার সময় এক পথচারী আহত হন। এর ছয়দিন পর, ৩০ জুলাই রাতে সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদি দোকান থেকে ট্রাভেল ব্যাগে রাখা প্রেসার কুকার আইইডি উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীরা জানান, এই বোমাটিতে টাইমার যুক্ত ছিল এবং এটি নির্দিষ্ট সময়ে বিস্ফোরণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দুটি ঘটনাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে।
এদিকে শনিবার সকালে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমাসদৃশ বস্তু দেখে পুলিশে খবর দেয় স্থানীয়রা। তবে বোম ডিসপোজাল ইউনিট পরীক্ষা করে জানায়, মিরপুরে পাওয়া বস্তুটি ছিল মূলত পান-সুপারির কৌটা এবং ফার্মগেটে পাওয়া বস্তার ভেতর ছিল পরিত্যক্ত আবর্জনা। সিটিটিসি প্রধান এক সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেন যে, এই দুটি ঘটনায় জননিরাপত্তার কোনো হুমকি ছিল না। তবে মতিঝিল ও আশুলিয়ার প্রকৃত বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আশুলিয়ায় উদ্ধার হওয়া আইইডির নির্মাণকৌশল, বিস্ফোরক উপাদান, টাইমিং ডিভাইস ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেশে বর্তমানে ঘরে বসেই আইইডি তৈরির সক্ষমতা অর্জনকারী কিছু ব্যক্তি রয়েছে। সম্প্রতি সাভার, কেরানীগঞ্জ ও রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের কেউ কেউ বিদেশে বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। এছাড়া পাকিস্তানভিত্তিক তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও লস্কর-ই-তৈয়বার (এলইটি) সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টিও নজরে রাখছেন তদন্তকারীরা। এসব চক্র অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও এনক্রিপটেড অ্যাপ ব্যবহার করে 'স্লিপার সেল' বা গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, যা নতুন উদ্বেগের কারণ।
অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, জঙ্গিবাদ এখন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। বড় কোনো হামলা না হওয়া মানেই জঙ্গিবাদ শেষ হয়ে যাওয়া নয়। অনলাইন প্রচারণা ও ক্ষুদ্র নেটওয়ার্ক মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব ও সামাজিক সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, বড় হামলার সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরীও জানিয়েছেন, উগ্রবাদ মোকাবিলায় র্যাব কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং সাইবার মনিটরিং সার্বক্ষণিক চালু রাখা হয়েছে।