‘স্ব-অবলম্বন’ থেকে ‘স্বাবলম্বন’ শব্দের উৎপত্তি। মানুষ যে মাটিতে আছাড় খায়, সেই মাটি আঁকড়ে ধরেই আবার উঠে দাঁড়ানোর নামই স্বাবলম্বন। একজন স্বাবলম্বী মানুষ নিজের মেধা, যোগ্যতা এবং মস্তিষ্কের ওপর আস্থা রাখেন; অলৌকিক কোনো সাহায্যের আশায় বসে থাকেন না। নিজের দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি আশপাশের দায়িত্বও তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেন। শূন্য থেকে শুরু করলেও ধাপে ধাপে কাজের পূর্ণতা অর্জন করাই স্বাবলম্বী মানুষের বৈশিষ্ট্য। ইসলামে স্বাবলম্বিতা বা আত্মনির্ভরশীলতাকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ গণ্য করা হয়, যা কেবল জাগতিক বিষয় নয় বরং ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
স্বাবলম্বী জীবনই যে সফল জীবন, তা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী থেকে সুস্পষ্ট। শৈশবে পিতৃহীন, ছয় বছর বয়সে মাতৃহীন এবং নয় বছর বয়সে দাদাকে হারানোর পর তিনি চাচার কাছে লালিত-পালিত হন। এতিম হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজেই মরুভূমিতে মেষ চড়ানোর মতো পরিশ্রমসাধ্য কাজ বেছে নিয়েছিলেন। তরুণ বয়সে প্রতিকূল পরিবেশ ও দীর্ঘ যাত্রাপথ পাড়ি দিয়ে বাণিজ্যে সফল হয়েছেন। ইসলামের প্রথম মসজিদ নির্মাণের সময়ও তিনি মাটি কাটার মতো কায়িক শ্রমে অংশ নিয়েছেন। অথচ যারা নিজের বিছানা গোছাতে বা সময়মতো ঘুম থেকে উঠতে পারে না, তারা জীবনযুদ্ধে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে থাকে।
ইসলামে দুনিয়া ও আখেরাতের উভয় কল্যাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুরা বাকারার ২০১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বান্দাকে স্বাবলম্বিতার দোয়া শিখিয়েছেন, ‘হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং পরকালেও কল্যাণ দিন।’ (সুরা বাকারা : ৩২)। সম্পদ খরচের ক্ষেত্রে কৃপণতা যেমন নিষেধ, তেমনি অপচয়ও নিষিদ্ধ। আল্লাহ আত্মনির্ভরশীলদের ভালোবাসেন, যার প্রমাণ মেলে মুসলিম শরিফের ৭৩২২ নম্বর হাদিসে, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুত্তাকি ও আত্মনির্ভরশীল বান্দার প্রশংসা করেছেন। এছাড়া সদকা ও দানের ক্ষেত্রেও রাসুলুল্লাহ (সা.) সাদ ইবনে মালেক (রা.)-কে পরামর্শ দিয়েছিলেন সন্তানকে নিঃস্ব রেখে না গিয়ে সম্পদ রেখে যেতে, যাতে তারা অন্যের কাছে হাত না পাতে। এই প্রসঙ্গে সহিহ বোখারি শরিফের ৩৯৩৬ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, বিদায় হজের বছর আমি ভয়ানক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হই। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে দেখতে আসেন। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার রোগ কী পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা আপনি দেখতে পাচ্ছেন। আমি একজন সম্পদশালী ব্যক্তি, কিন্তু আমার একমাত্র কন্যা ছাড়া আর কেউ নেই…’
পরমুখাপেক্ষিতা থেকে বাঁচতে প্রাণপণ চেষ্টা করলে মহান আল্লাহ বান্দাকে স্বাবলম্বী করে দেন। বোখারি শরিফের ১৪২৭ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দাতার হাত গ্রহীতার হাতের চেয়ে উত্তম। যে ব্যক্তি পবিত্র থাকতে চায়, আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখেন এবং যে পরমুখাপেক্ষিতা থেকে দূরে থাকতে চায়, আল্লাহ তাকে স্বাবলম্বী করে দেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কৃষিনির্ভর অর্থনীতিই স্বাবলম্বনের মূল ভিত্তি। দেশের তিন-চতুর্থাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বেকারত্ব দূর করতে চাকরির মোহ ত্যাগ করে শিক্ষিত যুবকরা এখন কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে মনোযোগী হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষির মান উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে অনেক শিক্ষিত বেকার আজ স্বাবলম্বী ও প্রতিষ্ঠিত। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই আত্মনিবেদন বাংলাদেশকে উন্নত দেশের মর্যাদায় উন্নীত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।