বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে ঘিরে দীর্ঘ নাটকের সর্বশেষ অধ্যায় হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে তার শর্তসাপেক্ষে জামিনে মুক্ত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। ইন্টারপোলের সহায়তায় দুবাই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর এই জামিন প্রক্রিয়া দেশের কূটনৈতিক ও আইনি মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, জামিনের শর্ত হিসেবে আদালতে একটি পাসপোর্ট জমা দিলেও তার কাছে একাধিক পাসপোর্ট থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা ব্যবহার করে তিনি ইউরোপের কোনো দেশে পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারেন। তবে বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং তাকে ফিরিয়ে আনতে আইনি লড়াই শুরু করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে বেশ কিছু জটিলতা রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশ ও আরব আমিরাতের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। ফলে আসামি হস্তান্তরের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা আমিরাত সরকারের নেই। দ্বিতীয়ত, দুবাইয়ের আইন অনুযায়ী গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির জামিন পাওয়ার অধিকার রয়েছে, যা বেনজীর আহমেদের আইনজীবীরা জোরালোভাবে কাজে লাগাচ্ছেন। তৃতীয়ত, প্রভাবশালী ও অর্থশালী ব্যক্তি হিসেবে তিনি নজরদারি এড়িয়ে পালানোর চেষ্টা করতে পারেন, যা তাকে ফিরিয়ে আনা আরও দুরূহ করে তুলবে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বেনজীরের আন্তর্জাতিক সংযোগ কাজে লাগিয়ে তাকে রক্ষায় একটি প্রভাবশালী পক্ষ নেপথ্যে লবিং চালাচ্ছে।
রোববার রাজশাহীতে এক মতবিনিময় সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সরকার দুবাইয়ে একটি ল ফার্ম নিয়োগ করেছে এবং জামিন আদেশের সত্যায়িত কপি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। তিনি আশাবাদী যে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, আরব আমিরাতের আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বেনজীর জামিন পেয়েছেন এবং তার বিষয়ে দেশটির সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত আছে। তিনি আরও জানান, দুবাই কর্তৃপক্ষের চাওয়ার প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগেই বেনজীর আহমেদ দেশ ছাড়েন। তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১১ এপ্রিল ২০২৫ তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করা হয়। গত ১২ জুন আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ ই-মেইলের মাধ্যমে তাকে গ্রেফতারের খবর জানায়। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণের আবেদন করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার সেই অনুযায়ী নথিপত্র পাঠালেও দুবাই পুলিশ আরও তথ্য ও আইনি ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দেয়। এই নথি আদান-প্রদানের মধ্যেই তার জামিনের খবর প্রকাশ পেল।