দেশের বাজারে প্রাপ্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে ভেজাল ও বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, সবজি থেকে শুরু করে শিশুখাদ্য, ভোজ্যতেল, মুড়ি ও গুড়—এমন কোনো পণ্যই যেন নিরাপদ নয়। এই বিষাক্ত খাদ্যের নিয়মিত সেবনে মানুষ ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষায় ১৯টি জেলা থেকে সংগৃহীত খাদ্যপণ্যের নমুনায় ভয়াবহ দূষণ শনাক্ত হয়েছে। শাকসবজিতে স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বেশি সিসা (সর্বোচ্চ ২.৩৭ পিপিএম) ও ক্যাডমিলেছে, যেখানে ১.১৬-২.৩৭ পিপিএম মাত্রার সিসার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে এবং ০.৩৩ পিপিএম ক্যাডমিয়াম শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া শাকসবজিতে ০.৩ পিপিএম সিসা থাকা স্বাভাবিক হলেও পাওয়া গেছে ২.৩৭ পিপিএম পর্যন্ত। পাশাপাশি এসব সবজিতে ই-কোলাই, ফিকাল কলিফর্ম ও সালমোনেলসহ মলের জীবাণু মিলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারী ধাতু শরীরের স্নায়ুতন্ত্র ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি করে এবং শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত করে।
পানির নমুনায়ও মলের জীবাণু বা ফিকাল কলিফর্মের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিএফএসএর তথ্যমতে, দিনাজপুরের প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে ১২০ সিএফইউ, খাগড়াছড়ির ১০০ মিলিলিটার পানিতে ৬০ সিএফইউ এবং বাগেরহাটে ৪৩ সিএফইউ ফিকাল কলিফর্ম শনাক্ত হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদের মতে, নিরাপদ পানিতে এর উপস্থিতি শূন্য হওয়ার কথা, অথচ এমন দূষিত পানি পান করলে ডায়রিয়া, আমাশয় ও টাইফয়েডের মতো রোগ ছড়ানো অনিবার্য।
অন্যান্য খাদ্যপণ্যের মধ্যে মুড়িতে ইউরিয়া এবং গুড়ে নিষিদ্ধ সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট পাওয়া গেছে। এছাড়া সরিষার তেলে উচ্চমাত্রার অ্যাসিড, সয়াবিন তেলে ট্রান্সফ্যাটের আধিক্য এবং দুগ্ধজাত পণ্যে কারসাজির প্রমাণ মিলেছে। মধু ও ঘিয়ের মতো পণ্যেও ভেজালের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডায়েটিশিয়ান সিরাজাম মুনিরা জানান, খাদ্যচক্রে এসব বিষ ঢুকে পড়ায় অ্যালার্জি ও সংক্রমণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি সচিবালয়ে আয়োজিত এক সভায় এসব সমস্যার দ্রুত সমাধানে তিন সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। এই কমিটিকে এক মাসের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও দ্রুত সমাধানযোগ্য সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর, বিএসটিআই ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এই সভায় ভেজালবিরোধী অভিযান আরও গতিশীল করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।