দায়িত্বগ্রহণের ৬ মাসে সরকারের দৃশ্যমান কোনো অর্জন নেই এবং সব ক্ষেত্রেই ব্যর্থতা স্পষ্ট বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে ‘বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মূল্যায়ন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, রফিকুল ইসলাম খান এমপি ও হামিদুর রহমান আজাদসহ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনীহা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণসহ মোট ৮টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, গুম প্রতিরোধ আইনে উদ্বেগজনক ফাঁক রাখা, স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দূরে রাখা এবং পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশলগত দুর্বলতার কারণে সরকার মানুষের কল্যাণে কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, জুলাই জাতীয় সনদভিত্তিক সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে জনগণ স্পষ্ট রায় দিয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮০টি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার ২৩১টি। অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোটের ব্যবধান আড়াই কোটিরও বেশি। তিনি অভিযোগ করেন, সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেও সংস্কার পরিষদের কাঠামো কার্যকর করা হয়নি, বরং সরকার সংবিধান সংশোধনের বিকল্প পথে হাঁটছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির নেতৃত্ব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার এবং শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার মতো ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের একটিও গত ছয় মাসে বাস্তবায়িত হয়নি।
জ্বালানি সংকট নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই কাঠামোগত ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন খাতে প্রভাব পড়ছে। তিনি দাবি করেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্পকারখানায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম উৎপাদন হচ্ছে, প্রায় ২০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতার দুর্বলতাও সামনে এনেছে।
সরকারি প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মেধা, দক্ষতা ও পেশাদারত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও প্রথম ছয় মাসেই প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ জোরালো হয়েছে। তার দাবি, একই সময়ে ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার শীর্ষ পদে বিএনপি নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনসহ ১২টি প্রতিষ্ঠানে বিএনপি নেতা-কর্মীদের নিয়োগের তথ্যও এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার আইনশৃঙ্খলাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বললেও সরকারি ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের তথ্য উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ তৈরি করছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, মার্চ-এপ্রিল সময়ে ৬০৫টি হত্যা, ২৯৪টি ছিনতাই, ১৯৬টি অপহরণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে মে মাসে ৯১৫টি হত্যা মামলা, ৪৬১টি ডাকাতি, ২৮৬টি অপহরণ, ৩ হাজার ২৭৭টি চুরি এবং ৫ হাজার ৪৪৮টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। তিনি দাবি করেন, শুধু মার্চ-মে ২০২৬ সময়ে ৯১৫টি হত্যা মামলা নিবন্ধিত হয়েছে, যেখানে পুরো ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭৬৭ এবং ২০২৪ সালে ৭৯৪টি।
দ্রব্যমূল্য ও ব্যাংকিং খাতের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে জুন ২০২৬-এ সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সামগ্রিক মূল্যস্তর এখনো বেশি, ফলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি জানান, মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।
পররাষ্ট্রনীতিতেও কৌশলগত দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ দর্শন ঘোষণা করলেও ছয় মাসে এটিকে সুস্পষ্ট ও সমন্বিত কাঠামোতে রূপ দিতে পারেনি। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ অমীমাংসিত বিষয়েও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে যাচাই করা হলেও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অজুহাতে প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি। এছাড়া গুম প্রতিরোধ আইনের খসড়া নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ জানিয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সবশেষে তিনি সরকারের প্রতি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করাসহ ৮ দফা দাবি জানান।
অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোটের ব্যবধান আড়াই কোটিরও বেশি।তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা ছিল এবং পরিষদকে প্রথম অধিবেশন থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সাংবিধানিক সংস্কার সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছিল।