রাজপরিবারের সঙ্গে তিক্ত সম্পর্কের জেরে ২০২০ সালে দায়িত্ব ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন প্রিন্স হ্যারি ও তাঁর স্ত্রী মেগান মার্কেল। দীর্ঘ ছয় বছর পর তাঁরা আবারও যুক্তরাজ্যে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে ক্যালিফোর্নিয়ার যে অভিজাত এলাকা মন্টেসিটোয় তাঁরা এতদিন বসবাস করেছেন, সেখানে তাঁদের বিদায়ের খবরটি স্থানীয়দের মধ্যে তেমন কোনো সাড়া ফেলেনি। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যমগুলো বিষয়টি নিয়ে সরব থাকলেও মন্টেসিটোর বাসিন্দারা এ ব্যাপারে অনেকটা নির্বিকার। স্থানীয় লেখক ও সাংবাদিক অ্যান লুইস বারডাখ জানিয়েছেন, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সাইটগুলোতে ব্যাংক ডাকাত খোঁজা বা চিড়িয়াখানার প্রাণীর মৃত্যুর মতো খবর থাকলেও হ্যারি-মেগানের চলে যাওয়ার বিষয়টি সেখানে ছিল না। তিনি মনে করেন, অপরাহ উইনফ্রের মতো তারকাদের বাস করা এই এলাকায় হ্যারি-মেগানের উপস্থিতি স্থানীয়দের কাছে খুব বড় কোনো বিষয় ছিল না।
লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত মন্টেসিটোয় ৯ হাজারের কম মানুষের বাস। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই এলাকায় বিশ্বের নামিদামি অনেক তারকা ও ধনকুবের বসবাস করেন। অনেকেই মনে করেন, এই তারকাদের ভিড়েই হ্যারি-মেগান অনেকটা আড়ালে থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন। সন্তান আর্চি ও লিলিবেটকে সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের স্কুলে ভর্তি করানোর লক্ষ্যেই তাঁরা এখন এলাকাটি ছাড়ছেন। নিউইয়র্ক টাইমস স্থানীয় বাসিন্দা ও সান্তা বারবারার মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখেছে, তাদের কাছে এই দম্পতির চলে যাওয়ার বিষয়টি পাশের বাড়ির কারো বাসা বদলানোর মতোই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। ২১ বছর বয়সী রায়ান সুজা ও ৭৬ বছর বয়সী বুজ বনসাল জানিয়েছেন, তাঁদের চলে যাওয়া বা থাকার বিষয়টি হ্যারি-মেগানের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
বিশ্বজুড়ে পরিচিতি থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে হ্যারি-মেগানের যোগাযোগ ছিল খুবই সীমিত। মন্টেসিটোর রিভেন রক এলাকায় হ্যারি–মেগানের বাড়ির কাছেই থাকেন ৭২ বছর বয়সী জিনা পেনিনো। তাঁদের চলে যাওয়ার বিষয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল এক শব্দে, ‘কিছুই না।’ তিনি বলেন, ‘তাঁরা যেখানে যেতে চান, যেতে পারেন।’ কয়েক কোটি ডলারের উঁচু দেয়াল ও কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত বাড়িতে থাকা এই দম্পতিকে নিয়ে স্থানীয়দের পরিচিতি মূলত তাঁদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সহকারীদের মাধ্যমে। নেটফ্লিক্সের তথ্য অনুযায়ী, তথ্যচিত্রটি ২ কোটি ৮০ লাখের বেশি পরিবার দেখেছিল। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে হ্যারি-মেগান তাঁদের সামাজিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে। প্রতিবেশীরা এই দম্পতির সঙ্গে খুব একটা কথা না বললেও তাঁদের নিরাপত্তাকর্মী, কুকুর হাঁটাতে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তি, সন্তানদের দেখাশোনার বিষয়গুলোই ছিল আলোচনার কেন্দ্র।
ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকাকালীন হ্যারি-মেগান ক্রমাগত আলোকচিত্রী ও সংবাদকর্মীদের পিছু নেওয়ার অভিযোগ করেছেন। ২০২০ সালে ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্যামেরা ব্যবহারের বিরুদ্ধে তাঁরা মামলাও করেছিলেন। এছাড়া ২০২১ সালে অপরাহ উইনফ্রের সাক্ষাৎকারে মেগান ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডগুলোর বর্ণবাদী আচরণ ও মানসিক চাপের কথা তুলে ধরেছিলেন। স্থানীয় সাইকেলের দোকানের মালিক জেনিফার ব্লেভিনস জানিয়েছেন, আর্চির জন্মদিনে সাইকেল উপহার দেওয়ার পর তাঁরা সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন, যদিও মেগানকে তিনি একজন ভালো মানুষ হিসেবেই মনে করেন।
লস অ্যাঞ্জেলেসের সাংবাদিক এলিজাবেথ হোমস মনে করেন, রাজা তৃতীয় চার্লসের শারীরিক অবস্থার কারণে তাঁদের যুক্তরাজ্যে ফেরা অস্বাভাবিক নয়। তবে নতুন করে গণমাধ্যমের নজর ও সন্তানদের গোপনীয়তা রক্ষা করা তাঁদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হতে পারে। লেখক ডিজে ওয়াল্ডি মনে করেন, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সঙ্গে তারকাদের সম্পর্ক বরাবরই অস্থায়ী, যা হ্যারি-মেগানের ক্ষেত্রেও প্রমাণিত হয়েছে।
আশপাশে থাকেন জেফ ব্রিজেস, রব লো, গিনেথ প্যালট্রো, অরল্যান্ডো ব্লুম, ক্যাটি পেরি, অপরাহ উইনফ্রেসহ আরও অনেক হলিউড তারকা।২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘হ্যারি অ্যান্ড মেগান’ তথ্যচিত্রের কিছু অংশও কাছের একটি বাড়িতে ধারণ করা হয়েছিল।
২০২৩ সালে আর্চির চতুর্থ জন্মদিনে তাঁরা তাকে একটি সাইকেল উপহার দেন।