জামায়াতে ইসলামীতে সাবেক বিচারপতি সৈয়দ শাহিদুর রহমানের যোগদানকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। গত মঙ্গলবার দলটিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার যে ৬৫০ জন ব্যক্তি যোগ দিয়েছেন, তাঁদেরই একজন এই সাবেক বিচারপতি। শাহিদুর রহমান হলেন দেশের ইতিহাসে প্রথম বিচারপতি, যিনি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে ২০০৪ সালে পদ থেকে অপসারিত হয়েছিলেন। জামায়াতে যোগ দেওয়া ব্যক্তি ও অপসারিত এই বিচারপতি যে একই ব্যক্তি, তা দলটির একজন দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেছেন।
গত মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিইবি) মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সাবেক বিচারপতি, ব্যবসায়ী ও কওমি আলেমসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ৬৫০ জন ব্যক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগ দেন। উক্ত অনুষ্ঠানে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানসহ দলটির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে জামায়াতের পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে সাবেক বিচারপতি সৈয়দ শাহিদুর রহমানের নাম পাওয়া যায়।
সৈয়দ শাহিদুর রহমানের জামায়াতে যোগদানের বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহকারী (রাজনৈতিক) রাশেদ খাঁন। তিনি লিখেছেন, শাহিদুর রহমান জামায়াতে যোগদান করে অতীতের সমস্ত বিতর্ক থেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। অপরাধী ও বিতর্কিতদের পুনর্বাসন করে সঠিক পথে আনার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য তিনি জামায়াতকে ধন্যবাদ জানান। রাশেদ খাঁন আরও মন্তব্য করেন, ভোটের আগে জান্নাতের টিকিটের মতো জামায়াত বর্তমানে ‘অপরাধী পাপ মুক্তকরণ টিকিট’ চালু করেছে বলে মনে হচ্ছে। এই বিষয়ে জামায়াতের বক্তব্য জানার জন্য দলের একাধিক নেতা ও মিডিয়া সেলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফোন ও খুদে বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
সাবেক এই বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগের সূত্রপাত হয়েছিল ২০০৩ সালের ১ অক্টোবরে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির তৎকালীন সভাপতি ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ অভিযোগ করেন, হাইকোর্টের একজন অতিরিক্ত বিচারক একটি নারী নির্যাতন মামলায় জামিন করিয়ে দেওয়ার জন্য ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন। আইনজীবীদের এক সভায় রোকনউদ্দিন মাহমুদ দাবি করেছিলেন, ওই অতিরিক্ত বিচারক তাঁর সহকর্মী অপর এক অতিরিক্ত বিচারকের মাধ্যমে এই অর্থ গ্রহণ করেন। এই অভিযোগের পর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান বিষয়টি তদন্তের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে পাঠানোর জন্য চিঠি লেখেন। পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পরামর্শে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ বিষয়টি তদন্তের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে পাঠান।
২০০৪ সালের ২৬ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান তদন্তের ফলাফল রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন এবং পরের দিন ২৭ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠান। এরপর প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পরামর্শ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক পদ থেকে সৈয়দ শাহিদুর রহমানকে অপসারণ করা হয়। ২০০৪ সালের ২০ এপ্রিল জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের ৬ দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সৈয়দ শাহিদুর রহমানকে অপসারণ করেছেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানের নেতৃত্বে গঠিত ওই জুডিশিয়াল কাউন্সিলের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি এম রুহুল আমিন ও বিচারপতি ফজলুল করিম।
২০০৪ সালে দেশে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল এবং সেই সরকারের আমলেই সৈয়দ শাহিদুর রহমানকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিকভাবে নিয়োগের কারণেই এমন ঘটনা ঘটেছে কি না—তৎকালীন আইনমন্ত্রী প্রয়াত মওদুদ আহমদের কাছে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, এই ঘটনার সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। শাহিদুর রহমানকে তাঁর সরকারই নিয়োগ দিয়েছিল, আবার সেই সরকারের আমলেই তাঁকে পদচ্যুত করা হয়েছে।
অপসারণের পরদিন ২১ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে সৈয়দ শাহিদুর রহমান দাবি করেছিলেন, তাঁর অপরাধ প্রমাণিত না হলেও তাঁকে বলির পাঁঠা বানিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তিনি কুৎসিত রাজনীতির শিকার হয়েছেন। এরপর তিনি অপসারণের আদেশের বিরুদ্ধে রিট করলে ২০০৫ সালে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রাষ্ট্রপতির অপসারণের আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করেন। তবে হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে ইদ্রিসুর রহমান নামের এক আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপতির অপসারণের আদেশ বহাল রাখেন। এর ফলে সৈয়দ শাহিদুর রহমানের বিচারকের পদে ফেরার সব পথ চূড়ান্তভাবে বন্ধ হয়ে যায়।