পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় বামপন্থি রাজনীতির আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ঐতিহ্য বহন করে আসা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে সবসময়ই প্রতিফলিত হয়ে এসেছে সাম্রাজ্যবাদ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী মনোভাব। তবে রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বামপন্থি ঐতিহ্য মুছে ফেলতে সক্রিয় হয়েছে একটি হিন্দুত্ববাদী ছাত্র সংগঠন।
সম্প্রতি ক্যাম্পাসে বহিরাগত হামলা ও ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মুখে বারবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগের দেওয়ালে কেন ‘কিষেণজি স্যালুট’ স্লোগান লেখা থাকে এবং কেন সেখান থেকে ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি’ স্লোগান ওঠে— তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দেওয়ালে ‘দেশবিরোধী’ স্লোগান লেখা রয়েছে বলে অভিযোগ তুলে এসব আবর্জনা ধুয়েমুছে সাফ করার কথাও বলেন তিনি। এই বিতর্কের জেরেই মূলত শুরু হয়েছে দেওয়াল লিখন মোছা ও পুনরায় লেখার এক লুকোচুরি খেলা, যা ক্যাম্পাসের রাজনীতিকে বারবার উত্তপ্ত করে তুলছে। মুখ্যমন্ত্রীর অলিখিত নির্দেশের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রাতারাতি সব দেওয়াল লিখন মুছে দিয়েছিল।
তবে কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপের ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই দেওয়ালে আবার ফিরে আসে স্লোগান। এবার দেওয়ালে লেখা হয় কার্ল মার্ক্সের সেই বিখ্যাত উক্তি— ‘আমাদের সময় যখন আসবে তখন আমরা বৈপ্লবিক শক্তি প্রয়োগ করতে দ্বিধা করবো না।’ এরপর এসএফআইয়ের পক্ষ থেকেও দেওয়াল লিখন কর্মসূচির মাধ্যমে নানা স্লোগানে নতুন করে ভরিয়ে দেওয়া হয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল। সোমবারের এই ঘটনার পর মঙ্গলবার গভীর রাতে আবারও সমস্ত দেওয়াল লিখন মুছে দেওয়া হয়।
ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগ, রাতের অন্ধকারে ক্যাম্পাসে ঢুকে এই দেওয়াল লিখনগুলো মুছে দেওয়া হয়েছে। মাঝরাতে খবর পেলেও শিক্ষার্থীরা হোস্টেলের বাইরে বের হতে পারেননি। পরে দেওয়াল মুছতে আসা ব্যক্তিরা ক্যাম্পাস থেকে চলে গেলে তারা সব দেওয়ালে সাদা রঙের ছোপ দেখতে পান। রেভলিউশনারি স্টুডেন্টস ফ্রন্টের (আরএসএফ) যাদবপুর ইউনিটের সম্পাদক ইন্দ্রানুজ রায় অভিযোগ করেন, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ তাঁর কাছে খবর আসে যে, কলকাতা পুলিশ এবং কলকাতা পুরসভার লোক পরিচয় দিয়ে বেশ কয়েকজন ৪ নম্বর গেট দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করছে। তারা নিজেদের পুরসভার লোক দাবি করে দেওয়াল হোয়াইট ওয়াশ করতে আসার কথা জানায় এবং পুলিশ তাদের পাহারা দিতে সঙ্গে আসে।
অথচ মঙ্গলবার সকালেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা ও মর্যাদা বজায় রাখার জন্য সব পক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান জানিয়েও তিনি শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করেন যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে বা বিভিন্ন কাঠামোতে যত্রতত্র স্লোগান, গ্রাফিতি বা পোস্টার না লাগানো হয়। এর বদলে মত প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে বলে তিনি শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করেছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এমন কর্মকাণ্ডের তীব্র বিরোধিতা করেছে সিপিআইএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআই। এসএফআই নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অঞ্জিল দাস বলেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সবসময়ই সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী। এ কারণেই ক্যাম্পাসের দেওয়ালে এই ধরনের স্লোগান ছিল। আরএসএসের ভূমিকা ফ্যাসিস্টদের মতো হওয়ায় ক্যাম্পাসের দেওয়ালে আরএসএসবিরোধী লেখাও ছিল বলে দাবি করেন তিনি। তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দেওয়াল লিখন মুছে দিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী মনোভাব থেকে সরানো যাবে না। তারা আবারও দেওয়াল লিখন শুরু করবেন এবং একই ধরনের স্লোগান দেওয়ালে লিখবেন।