দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সঙ্গে ডেঙ্গু ভাইরাসের ডেন-৩ ও ডেন-২ সেরোটাইপের মিশ্রণ সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীর ফার্মগেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিত্র তুলে ধরে খালেদা আক্তার জানান, তাঁর ডেঙ্গু আক্রান্ত ২২ বছর বয়সী ছেলে ফাতেমিকে নিয়ে দুটি সরকারি হাসপাতালে ঘুরেও কোনো শয্যা পাননি। বেসরকারি হাসপাতালের সাধারণ শয্যাগুলোও খালি না থাকায় দৈনিক আট হাজার টাকা ভাড়ার কেবিন নিতে বাধ্য হচ্ছেন তিনি। খালেদা আক্তারের মতো হাজারো পরিবার এখন ডেঙ্গুর চিকিৎসা করাতে গিয়ে চরম অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটে ভুগছেন।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪০ হাজার ৪৪ জন এবং মারা গেছেন ১১১ জন। গত বছরের (২০২৫ সালের) একই সময় পর্যন্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৩০৭ এবং মৃত্যু হয়েছিল ১৩০ জনের। আর ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১৪ হাজার ৩২৫ জন এবং মারা যান ৯৯ জন। তবে এই হিসাব কেবল হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের, মৃদু উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া রোগীরা এর বাইরে রয়ে গেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জুনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন ২ হাজার ৯০৭ জন, যা জুলাইয়ে তিন গুণের বেশি বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ জনে। আগস্টে এই সংখ্যা আরও বেড়ে ২০ হাজার ৫৩৬ জনে পৌঁছায়। সেপ্টেম্বরের প্রথম চার দিনেও রোগী বাড়ার এই গতি অব্যাহত রয়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে ২০১৯ সালে প্রথমবার ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা এক লাখ ছাড়ায় এবং ২০২৩ সালে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন আক্রান্ত ও ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুর মাধ্যমে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে যায়।
এবারের সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে ভাইরাসের একাধিক সেরোটাইপের উপস্থিতিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের (ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪) মধ্যে এবার ডেন-৩ বেশি সক্রিয় হলেও ডেন-২ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ছড়াচ্ছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী জানান, জুনে বান্দরবান, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে করা এক নমুনা জরিপে দেখা গেছে, বরগুনা ও পটুয়াখালীর শহরাঞ্চলে ডেন-৩ বেশি হলেও গ্রামাঞ্চলে ডেন-২ প্রধান ছিল। আবার বান্দরবানে ডেন-২ আক্রান্ত রোগী বেশি পাওয়া গেছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, একই সময়ে ডেন-২ ও ডেন-৩ সেরোটাইপের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি এই দ্রুত সংক্রমণের অন্যতম কারণ হতে পারে। কোনো একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর সাময়িক সুরক্ষা মিললেও অন্য সেরোটাইপে পুনরায় আক্রান্ত হলে গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। গত পাঁচ বছরে এই দুটি সেরোটাইপ পাল্টাপাল্টি ছড়ানোর কারণে এবং নতুন জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যে কোনো প্রতিরোধক্ষমতা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও মশা নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থা অত্যন্ত অপর্যাপ্ত। চলতি বছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ৪৮ জন হলেও বাকি বিশাল অংশই ঢাকার বাইরের। এমনকি বান্দরবানের রোয়াংছড়ির মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার বিস্তার ঘটেছে। খুলনার টুটপাড়ার এক বাসিন্দা ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে হন্যে হয়ে ঘুরেও শয্যা পাননি, পরে অনেক কষ্টে একটি বেসরকারি হাসপাতালে জায়গা পেয়েছেন। চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বাদে খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৩২৪ জন আক্রান্ত এবং ১৯ জন মারা গেছেন। এছাড়া শেষ ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ১০৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশার জানান, আগস্টের জরিপে বান্দরবানের মতো এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপক ব্রুটো ইনডেক্স (বিআই) ৪০-এর বেশি পাওয়া গেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আগস্টের জরিপেও লার্ভার ঘনত্ব উদ্বেগজনক পর্যায়ে (বিআই ২০ থেকে ৪০.৩৩) পাওয়া গেছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সেপ্টেম্বর মাসেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ জানান, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা তাঁদের কাজ নয়, তবে সরকারি হাসপাতালে শয্যার তুলনায় রোগী সব সময় বেশি থাকে এবং চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি হচ্ছে না। অন্যদিকে, আইইডিসিআরের পরিচালক কাজী আহমেদ জাকী বলেন, তাঁরা গবেষণার কাজ শেষ করে মশার ধরন ও সেরোটাইপের তথ্য জানালেও মাঠপর্যায়ে সেসব মেনে কতটুকু কাজ হয়েছে তা নিয়ে ঘাটতি রয়েছে।