নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বছরব্যাপী ফসল উৎপাদন করে ভাগ্যবদলের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল রাজশাহী বিভাগের ১০২ জন চাষিকে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় তাঁদের জন্য তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল বিশেষায়িত ‘পলিনেট হাউস’। কৃষি বিভাগ আশ্বস্ত করেছিল, অসময়ে উচ্চমূল্যের ফসল ফলিয়ে বিপুল লাভবান হবেন তাঁরা। তবে তিন বছর পর এসে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। বেশির ভাগ পলিনেট হাউসেই এখন কোনো ফসল উৎপাদন হচ্ছে না। উল্টো লোকসানের মুখে পড়া কৃষকদের সরকারি অনুষ্ঠানে ডেকে জোর করে বানানো সাফল্যের গল্প বলতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ১০২টি পলিনেট হাউস নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। প্রতিটি হাউস তৈরিতে গড়ে খরচ হয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা। বিশেষ পলিথিন, নেট ও লোহার কাঠামো দিয়ে তৈরি এই ঘরগুলোতে প্রতিকূল আবহাওয়া, পোকামাকড় ও রোগবালাই থেকে ফসল ও চারা সুরক্ষিত রেখে সারা বছর চাষাবাদের প্রযুক্তি রয়েছে। এতে প্রয়োজন অনুযায়ী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও সেচের ব্যবস্থাও যুক্ত থাকার কথা। তবে মাঠপর্যায়ে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে।
এই প্রকল্পের আওতায় পলিনেট হাউস পাওয়া চাষিদের সঙ্গে কৃষি বিভাগের ২৫ বছরের চুক্তি রয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, হাউসের কোনো ক্ষতি বা পরিবর্তন করা যাবে না এবং কৃষকদের নিজস্ব উদ্যোগে উচ্চমূল্যের ফসল চাষ করতে হবে। কোনো মৌসুমেই হাউস ফেলে রাখা যাবে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাউস ক্ষতিগ্রস্ত হলে এক মাসের মধ্যে চাষিকেই তা মেরামত করতে হবে। চাষি যদি হাউসটি ব্যবহার না করেন বা পরিবর্তন করেন, তবে সাত দিনের মধ্যে নির্মাণ ব্যয় সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে, অন্যথায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক বিঘা জমি আছে এমন আগ্রহী চাষিদের এই প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছিল, যেখানে চাষির কোনো টাকা লাগেনি। জমির ২৫ শতাংশের ওপর এই নেট হাউস নির্মাণ করা হয় এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওপরে পলিথিন ও নিচে নেট দেওয়া হয়, যা ৬০ শতাংশ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার কথা। এ ছাড়া তাপমাত্রা কমাতে কুয়াশার মতো পানি ছিটানোর জন্য ‘মিক্সড ইরিগেশন’ বা মিস্ট পদ্ধতি এবং গাছের গোড়ায় পানি দেওয়ার জন্য ‘ড্রিপ পদ্ধতি’ যুক্ত রয়েছে। এই হাউসে ক্যাপসিকাম, টমেটো, ব্রকলি, স্কোয়াশ, স্ট্রবেরি, মেলন, শসা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লেটুস, চিনাশাক এবং বিভিন্ন ধরনের ফুল চাষের কথা বলা হয়েছিল।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। মাঠপর্যায়ের চাষিরা বলছেন, যাঁরা আগে থেকেই পেশাদার চারা উৎপাদনকারী বা ফুলচাষি ছিলেন, তাঁরা কিছুটা সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু সাধারণ সবজি চাষিরা অসময়ের কোনো সবজি ফলাতে পারেননি। অনেকেই বাধ্য হয়ে পরিত্যক্ত হাউসে আঙুরগাছ লাগিয়ে রেখেছেন। চাষিদের অভিযোগ, অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে এই হাউসগুলো নির্মাণ করায় এগুলো টেকসই হয়নি এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। অন্যদিকে কৃষি কর্মকর্তাদের দাবি, কৃষকেরা সঠিক পরামর্শ না মানায় সফল হতে পারছেন না। রাজশাহী বিভাগে নির্মিত ১০২টি পলিনেট হাউসের মধ্যে রাজশাহী জেলায় ২২টি, নাটোরে ২৯টি, নওগাঁয় ৭টি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৬টি, পাবনায় ১৭টি, জয়পুরহাটে ৬টি, বগুড়ায় ১১টি ও সিরাজগঞ্জে ৪টি রয়েছে। এ ছাড়া হর্টিকালচার সেন্টারগুলোতে আরও ৯টি হাউস করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্প্রতি পাবনা, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৬ জন চাষির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের মধ্যে ১০ জনই এই হাউস ব্যবহার করে বড় ধরনের লোকসানের শিকার হয়েছেন। মাত্র ছয়জন চাষি লোকসান হয়নি বলে জানিয়েছেন, যাদের চারজন চারা উৎপাদনে, একজন আঙুর চাষে এবং একজন ফুল চাষে যুক্ত। সরেজমিন পাবনার ঈশ্বরদী ও রাজশাহীর বাঘা ও পবা উপজেলার সাতটি পলিনেট হাউস ঘুরে দেখা গেছে, চারটির পলিথিন ছিঁড়ে গেছে এবং একটির পলিথিন সম্পূর্ণ খুলে ফেলা হয়েছে। ঈশ্বরদীর বখতারপুর গ্রামের চাষি নজরুল ইসলাম জানান, পলিনেট হাউসে চাষ করতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হয়ে তিনি পলিথিন খুলে এখন পটোল চাষ করছেন। তিনি বলেন, এই জমি ইজারা দিলে বছরে এক লাখ টাকা পেতেন, অথচ হাউসের ভেতরে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে কোনো কাজ করা যায় না। ঈশ্বরদীর মহাদেবপুর গ্রামের শাহিনুজ্জামান গ্রীষ্মকালীন টমেটো ও করলা চাষে ব্যর্থ হয়ে এখন এক পাশে আঙুরগাছ লাগিয়েছেন। জগন্নাথপুর গ্রামের বেলি বেগমের হাউসে পালংশাক ও টমেটোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। রাজশাহীর পবা উপজেলার মর্তুজা আহমেদ জানান, কোনো ফসল ফলাতে না পেরে তিনি ১০ লাখ টাকা লোকসান গুনেছেন এবং এখন শুধু আঙুরগাছ লাগিয়ে রেখেছেন।
চাষিদের বড় অভিযোগ, পলিনেট হাউস পরিচালনার জন্য তাঁদের কোনো বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। শুধু অভিজ্ঞতা বিনিময়ের নামে দুবার ডাকা হয়েছিল। নওগাঁর রানীনগর উপজেলার চাষি মাসুদ রানা জানান, তিনি এই হাউসের কারণে ১০ লাখ টাকা লোকসান করেছেন। পাবনার এক সভায় এক বিশেষজ্ঞের পরামর্শে তিনি এক লাখ টাকার বিদেশি বীজ কিনে আরও তিন লাখ টাকা খরচ করে চাষ করেছিলেন, কিন্তু ফলন হয়েছে সাধারণ চাষের চেয়ে অর্ধেক। তিনি আরও অভিযোগ করেন, কারিগরেরা ২০০ মাইক্রন ঘনত্বের পলিথিন দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে ১০০ মাইক্রোনের কম ঘনত্বের পলিথিন দেওয়া হয়েছে। নওগাঁ সদরের চাষি আব্দুল লতিফ বলেন, দুই নম্বর জিনিস দিয়ে হাউস বানানো হয়েছে, যা দ্রুত ছিঁড়ে যাচ্ছে। এখন শুধু দেখানোর জন্য আঙুর লাগিয়ে রাখা হয়েছে।
পলিনেট হাউসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘মিক্সড ইরিগেশন সিস্টেম’ বা মিস্ট মেশিনগুলো বেশির ভাগ জায়গাতেই অচল। প্রকল্প কর্মকর্তাদের দাবি, চাষিরা এগুলো ব্যবহার না করে ফেলে রাখায় এবং বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিতে অতিরিক্ত আয়রন ও খরতা থাকার কারণে যন্ত্রগুলো নষ্ট হয়েছে। তবে চাষিদের দাবি, ঘর ঠান্ডা রাখতে এই মেশিন সারাক্ষণ চালাতে হয়, আর বেশি চালালে ভেতরে আর্দ্রতা বেড়ে ছত্রাকের আক্রমণ ঘটে। এক বছরের মাথায় মেশিনগুলো নষ্ট হলেও প্রকল্প থেকে তা মেরামত করে দেওয়া হয়নি। তবে নাটোরের নলডাঙ্গার চারা উৎপাদনকারী ইলিয়াস শেখ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের জারবেরা ফুলচাষি সাদিকুল ইসলাম, চারঘাটের মনোয়ার হোসেন এবং জয়পুরহাটের শৌখিন চাষি আমিনুল ইসলাম চারা ও ফুল চাষ করে কিছুটা লাভবান হয়েছেন। আমিনুল ইসলাম নিজের খরচে ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে ক্যাকটাস ও চারা চাষ করছেন, যার একটি ক্যাকটাসের দামই ২০ হাজার টাকা।
এদিকে, নওগাঁর এক চাষি জানান, গত তিন বছরে তিনি ২৮ রকমের ফসল চাষের চেষ্টা করে একটিতেও সফল হননি। তিনি অভিযোগ করেন, প্রকল্প শুরুর এক বছর পর পাবনার হর্টিকালচার সেন্টারে এক মতবিনিময় সভায় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের কড়া নজরদারিতে চাষিদের বানিয়ে বানিয়ে সফলতার গল্প বলতে বাধ্য করা হয়েছিল। তবে একপর্যায়ে এক চাষি সত্য কথা বলে দিলে পুরো সভায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। দুই বছর আগে নাটোরে এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় চাষিরা প্রকল্প পরিচালকের কাছে লিখিত আবেদন দিয়ে জানিয়েছিলেন যে, পলিনেট হাউসগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী এবং এগুলো মেরামত করে উপযুক্ত বীজ সরবরাহ করা প্রয়োজন। বগুড়া সদরের এক চাষি, যাঁকে কৃষি বিভাগ সফল বলে প্রচার করেছিল, তিনিও স্বীকার করেছেন যে এটি এখন একটি লোকদেখানো প্রকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মো. আহসানুল হক এ বিষয়ে বলেন, শীতপ্রধান দেশে ঠান্ডার হাত থেকে ফসল বাঁচাতে পলিনেট হাউস কার্যকর হলেও বাংলাদেশের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশে ভেতরের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ু চলাচল ফসলের উপযোগী রাখা অত্যন্ত জরুরি। একেকটি ফসলের জন্য আলাদা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকা দরকার, কিন্তু আমাদের দেশে সব ফসলের জন্য একই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই কারিগরি ত্রুটির কারণেই প্রকল্পটি সফল হচ্ছে না।
পুরো ‘আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন’ প্রকল্পটি মূলত ১৮৭ কোটি টাকার। এর আওতায় পলিনেট হাউস ছাড়াও ১০ হাজার ৭৩৩টি কৃষি যন্ত্রপাতি ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে দেওয়া হয়েছে এবং বগুড়া ও রাজশাহীতে সাড়ে ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। কৃষকেরা জানান, পাঁচ বছর পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এক বছরের মাথায় আর কাউকে পাশে পাওয়া যায়নি। তবে কৃষকদের সব অভিযোগ অস্বীকার করে প্রকল্প পরিচালক ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক এস এম হাসানুজ্জামান বলেন, চাষিরা পরিশ্রম করতে চান না এবং পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন না বলেই সফল হচ্ছেন না। পলিথিন ও অন্যান্য সমস্যার বিষয়ে তিনি বলেন, ঠিকাদারের এক বছরের ফ্রি সার্ভিস এবং তিন বছরের পলিথিন মেরামতের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন চাষিদের নিজেদেরই এটি চালাতে হবে। তিনি কৃষকদের এখন উন্মুক্ত চাষের চেয়ে ঘরের ভেতরে ভালো ফলন পাওয়া যাবে দাবি করে আঙুর চাষের পরামর্শ দিচ্ছেন। অন্যদিকে, ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হাউস মেরামতের জন্য সরকারি সহায়তার আবেদন জানিয়ে এখনো কোনো সাড়া পাননি পবার দারুশা গ্রামের চাষি সারোয়ার হোসাইন, যিনি ইতিপূর্বে উচ্চমূল্যের ফসল চাষ করতে গিয়ে ৫ লাখ টাকা হারিয়েছেন।
মেরামত করতে তাঁর ৭০-৮০ হাজার টাকা লাগবে।