বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জন্য জ্বালানি তেলবাহী একটি ট্যাংকারের চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন গুণের বেশি সময় লেগেছে। গত ২৩ জুলাই সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে যাত্রা করা ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামের জাহাজটি লোহিত সাগরের কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালির নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে সুয়েজ খাল, ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে গত শনিবার চট্টগ্রামে পৌঁছেছে। এই দীর্ঘ পথ ঘুরতে জাহাজটির সময় লেগেছে প্রায় ৫০ দিন, যা সরাসরি বাব আল-মানদেব হয়ে এলে মাত্র ১৬ দিন লাগত। ট্যাংকারটির স্থানীয় প্রতিনিধি প্রাইম ওশেন ট্রেড লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (অপারেশনস) পি কে রয় জানান, এভাবে ঘুরতি পথে আসার কারণে একটি ট্যাংকারেই বাড়তি প্রায় ৪০ লাখ ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি ইরান যুদ্ধের কারণে বিঘ্নিত হওয়ায় বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তবে সম্প্রতি ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের মোখা বন্দর এবং বাব আল-মানদেবের সবচেয়ে সরু অংশে অবস্থিত কৌশলগত পেরিম বা মাইয়ুন দ্বীপ দখল করে নেওয়ার পর এই পথেও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যদিও হুতিরা দাবি করেছে যে সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া অন্য দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ থাকবে, তবুও বিশ্বজুড়ে জাহাজমালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই সংকটের প্রভাব কেবল জ্বালানি আমদানিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই পথেই সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে যায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব, মিসর, মরক্কো এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৫৫১ কোটি ডলার। আর এসব অঞ্চল থেকে আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৯৩ কোটি ডলারের পণ্য। সব মিলিয়ে এই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল বাণিজ্যের পরিমাণ ৪ হাজার ৬৪৫ কোটি ডলার, যা দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের (১১ হাজার ৯৩৯ কোটি ডলার) প্রায় ৩৯ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৭৭ শতাংশই এই পথ ব্যবহার করে গন্তব্যে পৌঁছায়, যেখানে আমদানির ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ১৫ শতাংশ।
আপাতত পুরো বাণিজ্য স্থবির না হলেও পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এবং জাহাজগুলো বাব আল-মানদেব এড়িয়ে উত্তমাশা অন্তরিপ ঘুরে চলাচল শুরু করলে সময় ও খরচ দুটোই অনেক বেড়ে যাবে। শিপিং এজেন্টদের হিসাব অনুযায়ী, আফ্রিকা ঘুরে যাতায়াত করতে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগবে, যা জাহাজের জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। সাধারণত সমুদ্রপথের ভাড়া বিদেশি ক্রেতারা বহন করলেও হঠাৎ বেড়ে যাওয়া এই ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত দেশের রপ্তানিকারকদের ওপরই এসে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এ প্রসঙ্গে বলেন, পণ্য পরিবহনের বাড়তি ভাড়া বিদেশি ক্রেতারা দিলেও পরোক্ষ প্রভাবটি আমাদের ওপরেই পড়বে। বিশেষ করে তুরস্ক থেকে পোশাকের কাঁচামাল এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে তুলা আমদানিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে, যা উৎপাদন ও রপ্তানির সময়সূচিকে চাপের মুখে ফেলবে।
এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মার্চ ও এপ্রিলে বাংলাদেশে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছিল। বর্তমানে দেশে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং দেশজুড়ে লোডশেডিং চলছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও চাপ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশে কোনো জাহাজ না আসায় বাব আল-মানদেবের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে। সেখানে পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে বিমা ব্যয়, জাহাজভাড়া ও সরবরাহব্যবস্থায় চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে যেসব প্রতিযোগী দেশ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল নয়, তাদের তুলনায় বাংলাদেশ রপ্তানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দামের মধ্যে আমদানি ব্যয় আরও বাড়বে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে এখনই বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি মধ্য মেয়াদে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।